মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে সৌদি আরব, ইরাকি কুর্দিস্তান ও ইসরায়েলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে উৎপাদন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাস তানুরা শোধনাগারে ড্রোন হামলা
সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল পরিশোধন সক্ষমতাসম্পন্ন রাস তানুরা শোধনাগার সোমবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। একটি সূত্র জানায়, ড্রোন হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, দুটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়। ধ্বংসাবশেষ পড়ে সীমিত আকারের আগুন লাগলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রাস তানুরা সৌদি আরবের উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কমপ্লেক্সের অংশ। এটি দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রধান টার্মিনাল হিসেবেও কাজ করে। শোধনাগারের কিছু ইউনিট বন্ধ থাকলেও স্থানীয় বাজারে জ্বালানি সরবরাহে কোনো প্রভাব পড়েনি বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।

কুর্দিস্তানে তেল উৎপাদন স্থগিত
ইরাকি কুর্দিস্তানে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অধিকাংশ তেলক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে এই অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ব্যারেল তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে তুরস্কের জেইহান বন্দরে রপ্তানি করা হয়েছিল।
ডিএনও, গালফ কিস্টোন পেট্রোলিয়াম, ডানা গ্যাস ও এইচকেএন এনার্জিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলের গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ
ইসরায়েলের উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত বৃহৎ লেভিয়াথান গ্যাসক্ষেত্রও বন্ধ রয়েছে। শেভরন পরিচালিত এই ক্ষেত্রটি দেশটির অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎস। এছাড়া এনারজিয়ান তাদের ছোট গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন জাহাজও বন্ধ রেখেছে।
এর ফলে মিশরে গ্যাস রপ্তানিতেও প্রভাব পড়েছে, যা আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা, তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী
রোববার হরমুজ প্রণালির আশপাশে জাহাজে হামলার পর ওই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।
সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ ডলারের ওপরে উঠে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শোধনাগার ও গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।
উত্তেজনার বড় ধাপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা
ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক টরবিয়র্ন সোলভেদ্ট বলেন, রাস তানুরা শোধনাগারে হামলা একটি বড় ধরনের উত্তেজনার ইঙ্গিত দেয়। এতে উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো সরাসরি ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

তার মতে, এই পরিস্থিতি সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অন্যান্য দেশকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আগেও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সৌদি স্থাপনা
সৌদি আরবের সুরক্ষিত জ্বালানি স্থাপনাগুলো অতীতেও হামলার শিকার হয়েছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আবকাইক ও খুরাইস স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাময়িকভাবে দেশটির অর্ধেকের বেশি অপরিশোধিত তেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
২০২১ সালেও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী রাস তানুরা স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও জটিল আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















