মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। লেবানন সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশেও হামলা হয়েছে। এমনকি কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ভুলবশত তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল ও বিস্তৃত হচ্ছে।
সংঘাতের বিস্তার ও নতুন ফ্রন্ট
সোমবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালায় লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। জবাবে ইসরায়েল বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ১৪৯ জন আহত হয়েছে।
ইসরায়েল হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেমকে ‘টার্গেট’ ঘোষণা করেছে। তবে আপাতত স্থল অভিযান চালানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে তেলআবিব।
কুয়েতে ভুলবশত মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত
ইরানের হামলার সময় কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ভুল করে তিনটি মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ছয়জন ক্রু সদস্যকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে একটি বিমানকে আগুন জ্বলতে জ্বলতে মাটিতে পড়ে বিস্ফোরিত হতে দেখা যায়।
এর আগে একই অভিযানে তিনজন মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। তারা কুয়েতের একটি ঘাঁটিতে অবস্থান করছিলেন।
ইরানের পাল্টা হামলা ও উপসাগরীয় উত্তেজনা
ইরান দাবি করেছে, তারা কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটি, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ এবং দূরবর্তী সাইপ্রাসে ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসের আশপাশে কালো ধোঁয়া দেখা গেছে। দুবাই, দোহা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামহা এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

সৌদি আরব তাদের বৃহত্তম তেল শোধনাগার সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে ড্রোন হামলাজনিত অগ্নিকাণ্ডের কারণে। উপসাগরে বহু তেল স্থাপনা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটিতে হামলা
সাইপ্রাসের আকরোতিরি ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে একটি ড্রোন আঘাত হানে। ব্রিটেন ও সাইপ্রাস জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি সীমিত এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ইউরোপীয় মিত্ররা শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করলেও পরবর্তীতে ইরানের পাল্টা হামলার প্রেক্ষিতে সহায়তার কথা জানিয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি
সপ্তাহান্তের বোমাবর্ষণে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বহু মানুষ রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ খামেনির মৃত্যু উদযাপন করলেও, দেশটির রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতৃত্ব ক্ষমতা ছাড়ার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, তিনি, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের এক সদস্য নিয়ে গঠিত একটি নেতৃত্ব পরিষদ সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করছে। খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা আলি লারিজানি জানিয়েছেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসবে না।
ট্রাম্পের অবস্থান ও রাজনৈতিক ঝুঁকি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে বলে জানিয়েছেন। তিনি ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং আত্মসমর্পণকারীদের জন্য নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই অভিযানের প্রতি সমর্থন সীমিত। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র এক-চতুর্থাংশ আমেরিকান এই সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় এটি ট্রাম্পের দলের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক লাফে বেড়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে যায়। বহু তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ উপসাগরে নোঙর ফেলেছে। শেয়ারবাজারে পতন এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক বড় বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সংঘাতের এই বিস্তার মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















