০৮:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬
আগের ধস কাটিয়ে শুরুতেই ঘুরে দাঁড়াল ডিএসই ও সিএসই সাতক্ষীরার শ্যামনগরে প্রেস ক্লাব সভাপতির ওপর হামলা, আটক ২ সিরাজগঞ্জে সেচ নিয়ে সংঘর্ষে আহত ১৯ রাজশাহীতে গণপিটুনিতে নিহত এক, আহত ৭ ইরানের ক্ষমতা হস্তান্তরে বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধের বিস্তার রোধ করতে হবে ইরানে হামলার আগে মোদির ইসরায়েল সফর নিয়ে বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা ইরানের পর ট্রাম্প, তেল ও তাইওয়ান নিয়ে কঠিন হিসাবের মুখে চীন পাকিস্তানের হামলার লক্ষ্য বাগরাম ঘাঁটি, দাবি আফগানিস্তানের রফতানিতে বড় ধাক্কা: ফেব্রুয়ারিতে তৈরি পোশাকে পতন ১৩ শতাংশের বেশি, চাপে অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তৃত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি

জ্বালানি তেলের দামের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থাই আসল প্রশ্ন, ওপেক প্লাসের উৎপাদন বৃদ্ধি নয়

অস্ট্রেলিয়ার লন্সেস্টন থেকে বিশ্লেষণ— মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত যখন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, ঠিক তখন তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক প্লাস এপ্রিল মাস থেকে দৈনিক ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারের দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব খুবই সীমিত।

প্রায় এক দশকের ইতিহাসে এটি সম্ভবত জোটটির সবচেয়ে কম তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ, বিশ্বব্যাপী দৈনিক তেলের চাহিদার তুলনায় এই বাড়তি সরবরাহ মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশের সমান। এমন এক সময়ে এই বৃদ্ধি কার্যত প্রতীকী, যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই সরবরাহ ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

বাজারে প্রতীকী বার্তা, বাস্তবে অনিশ্চয়তা
রবিবারের বৈঠকের আগে বিশ্লেষকেরা দৈনিক ১ লাখ ৩৭ হাজার ব্যারেল বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। বাস্তবে তার চেয়ে বেশি ঘোষণা এলেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। বরং সোমবার লেনদেন শুরুতেই ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ দশমিক ৩৭ ডলারে পৌঁছে যায়, যা এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরে কিছুটা কমে ৭৯ ডলারের কাছাকাছি স্থিত হয়।

এ থেকে স্পষ্ট, বাজার এখন উৎপাদন বৃদ্ধির ঘোষণার দিকে নয়, বরং সংঘাতের স্থায়িত্ব ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার সময়কাল নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।

ইরান–ইসরায়েল সংঘাত ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং তার পাল্টা জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেসামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলা কৌশলগতভাবে ভুল না সঠিক— তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর প্রভাব স্পষ্ট। আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং প্রবাসী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা স্বাভাবিক। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংঘাত কতদিন চলবে এবং ততদিন সরবরাহ পরিস্থিতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
বিশ্বের প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি প্রতিদিন হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। বর্তমানে বড় ধরনের সংঘাতের কারণে জাহাজ মালিক ও বীমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। ফলে প্রণালিটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত ইরান সরাসরি প্রণালিটি অবরোধের চেষ্টা করেনি। তাই যুদ্ধ থামলে দ্রুতই জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সরবরাহ সংকট কমাতে সহায়ক হবে।

চীন ও ভারতের সম্ভাব্য পদক্ষেপ
বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক চীন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমদানি বাড়ালেও মূল্যবৃদ্ধির কারণে আগামী মাসগুলোতে আমদানি কমাতে পারে। জানুয়ারিতে তাদের আমদানি ছিল প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন এবং ফেব্রুয়ারিতে তা আরও বেড়েছে। তবে উচ্চমূল্যের প্রভাবে মে–জুন নাগাদ আমদানি কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক ভারত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা সত্ত্বেও রাশিয়া থেকে তেল আমদানিতে আবারও ঝুঁকতে পারে। ভারতের জন্য সরবরাহ নিরাপত্তাই এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

প্রয়োজনে কৌশলগত মজুত ব্যবহারের সম্ভাবনা
যদি দীর্ঘ সময় হরমুজ প্রণালিতে জটিলতা বজায় থাকে, তবে আমদানিকারক দেশগুলো কৌশলগত মজুত ব্যবহার করতে পারে। একই সঙ্গে অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশ উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করবে।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ঝুঁকি
শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, কাতারের প্রায় সব তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে রপ্তানি হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে গ্যাস বাজারেও একই ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

মূল্য বেড়ে গেলে চীন স্পট বাজার থেকে ক্রয় কমাতে পারে, এমনকি চুক্তিভিত্তিক কিছু চালান পুনর্বিক্রিও করতে পারে। ভারতসহ মূল্যসংবেদনশীল দেশগুলো আমদানি কমাবে। ইউরোপও শীতকালীন মজুত পুনর্গঠনের গতি কমাতে পারে।

সংঘাতের স্থায়িত্বই মূল নির্ধারক
অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস— উভয় বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই: যুদ্ধ কতদিন চলবে? দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে উভয় পক্ষের সামরিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরও বড় বিষয় হলো জ্বালানির দাম যদি দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকে, তাহলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর জনচাপ বাড়বে এবং সংঘাত বন্ধের তাগিদ জোরদার হবে।

সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওপেক প্লাসের সীমিত উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার স্থায়িত্বই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আগের ধস কাটিয়ে শুরুতেই ঘুরে দাঁড়াল ডিএসই ও সিএসই

জ্বালানি তেলের দামের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থাই আসল প্রশ্ন, ওপেক প্লাসের উৎপাদন বৃদ্ধি নয়

০৬:৩৪:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

অস্ট্রেলিয়ার লন্সেস্টন থেকে বিশ্লেষণ— মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত যখন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, ঠিক তখন তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক প্লাস এপ্রিল মাস থেকে দৈনিক ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারের দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব খুবই সীমিত।

প্রায় এক দশকের ইতিহাসে এটি সম্ভবত জোটটির সবচেয়ে কম তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ, বিশ্বব্যাপী দৈনিক তেলের চাহিদার তুলনায় এই বাড়তি সরবরাহ মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশের সমান। এমন এক সময়ে এই বৃদ্ধি কার্যত প্রতীকী, যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই সরবরাহ ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

বাজারে প্রতীকী বার্তা, বাস্তবে অনিশ্চয়তা
রবিবারের বৈঠকের আগে বিশ্লেষকেরা দৈনিক ১ লাখ ৩৭ হাজার ব্যারেল বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। বাস্তবে তার চেয়ে বেশি ঘোষণা এলেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। বরং সোমবার লেনদেন শুরুতেই ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ দশমিক ৩৭ ডলারে পৌঁছে যায়, যা এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরে কিছুটা কমে ৭৯ ডলারের কাছাকাছি স্থিত হয়।

এ থেকে স্পষ্ট, বাজার এখন উৎপাদন বৃদ্ধির ঘোষণার দিকে নয়, বরং সংঘাতের স্থায়িত্ব ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার সময়কাল নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।

ইরান–ইসরায়েল সংঘাত ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং তার পাল্টা জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেসামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলা কৌশলগতভাবে ভুল না সঠিক— তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর প্রভাব স্পষ্ট। আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং প্রবাসী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা স্বাভাবিক। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংঘাত কতদিন চলবে এবং ততদিন সরবরাহ পরিস্থিতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
বিশ্বের প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি প্রতিদিন হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। বর্তমানে বড় ধরনের সংঘাতের কারণে জাহাজ মালিক ও বীমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। ফলে প্রণালিটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত ইরান সরাসরি প্রণালিটি অবরোধের চেষ্টা করেনি। তাই যুদ্ধ থামলে দ্রুতই জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সরবরাহ সংকট কমাতে সহায়ক হবে।

চীন ও ভারতের সম্ভাব্য পদক্ষেপ
বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক চীন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমদানি বাড়ালেও মূল্যবৃদ্ধির কারণে আগামী মাসগুলোতে আমদানি কমাতে পারে। জানুয়ারিতে তাদের আমদানি ছিল প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন এবং ফেব্রুয়ারিতে তা আরও বেড়েছে। তবে উচ্চমূল্যের প্রভাবে মে–জুন নাগাদ আমদানি কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক ভারত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা সত্ত্বেও রাশিয়া থেকে তেল আমদানিতে আবারও ঝুঁকতে পারে। ভারতের জন্য সরবরাহ নিরাপত্তাই এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

প্রয়োজনে কৌশলগত মজুত ব্যবহারের সম্ভাবনা
যদি দীর্ঘ সময় হরমুজ প্রণালিতে জটিলতা বজায় থাকে, তবে আমদানিকারক দেশগুলো কৌশলগত মজুত ব্যবহার করতে পারে। একই সঙ্গে অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশ উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করবে।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ঝুঁকি
শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, কাতারের প্রায় সব তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে রপ্তানি হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে গ্যাস বাজারেও একই ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

মূল্য বেড়ে গেলে চীন স্পট বাজার থেকে ক্রয় কমাতে পারে, এমনকি চুক্তিভিত্তিক কিছু চালান পুনর্বিক্রিও করতে পারে। ভারতসহ মূল্যসংবেদনশীল দেশগুলো আমদানি কমাবে। ইউরোপও শীতকালীন মজুত পুনর্গঠনের গতি কমাতে পারে।

সংঘাতের স্থায়িত্বই মূল নির্ধারক
অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস— উভয় বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই: যুদ্ধ কতদিন চলবে? দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে উভয় পক্ষের সামরিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরও বড় বিষয় হলো জ্বালানির দাম যদি দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকে, তাহলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর জনচাপ বাড়বে এবং সংঘাত বন্ধের তাগিদ জোরদার হবে।

সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওপেক প্লাসের সীমিত উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার স্থায়িত্বই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।