বহু বছর ধরে ভারত তার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘ডিহাইফেনেশন’ কৌশল অনুসরণ করে আসছে। অর্থাৎ, পরস্পরবিরোধী দেশগুলোর সঙ্গে আলাদা আলাদা সম্পর্ক বজায় রেখে একটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যেন অন্যটির সঙ্গে সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত সেই ভারসাম্য নীতিকেই কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতা
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনা ঘটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তেল আবিব সফর শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই। ফলে ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টি নিয়ে সরব হয়ে ওঠে।
কংগ্রেস নেতা জয়ারাম রমেশ সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ তোলেন, মোদির ইসরায়েল সফরের পরপরই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর যৌথ হামলা শুরু করেছে। তাঁর দাবি, গত কয়েক মাসের সামরিক প্রস্তুতির পরিপ্রেক্ষিতে এই পরিস্থিতি অনুমেয় ছিল এবং এমন সময়ে সফর করা লজ্জাজনক।

ভারতের প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক তৎপরতা
ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তারা ইরান পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং সংযম ও সংলাপের আহ্বান জানায়। প্রধানমন্ত্রী মোদি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত সংঘাত বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর আলাদাভাবে ইসরায়েল ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে উত্তেজনা কমানো, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
অস্ত্র, বন্দর ও প্রবাসী স্বার্থ
ইসরায়েল ভারতের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি অংশীদার। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের মোট অস্ত্র রপ্তানির প্রায় ৩৪ শতাংশই যায় ভারতে। এ ছাড়া এশিয়ায় ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ভারত, যেখানে ২০২৫ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

মোদির সাম্প্রতিক ইসরায়েল সফরে একাধিক চুক্তি সই হয়। এর মধ্যে ভারতের নিজস্ব ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেসের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করার বিষয়ও রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাবাহার বন্দর প্রকল্পের অংশীদার। এই বন্দর ভারতের জন্য আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পাকিস্তানকে এড়িয়ে স্থলপথে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করে।
এর পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৯০ লাখ ভারতীয় নাগরিক কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রতিবছর ভারতের অর্থনীতিতে কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার যোগ করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যও প্রায় ১১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সাম্প্রতিক উত্তেজনায় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ভারসাম্যের নতুন বাস্তবতা
পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েল, ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে ভারত দীর্ঘদিন তিনটি শক্তিকেন্দ্র হিসেবে দেখেছে। তবে বর্তমান সংঘাতের পর নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে, যেখানে আগের মতো ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হবে। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করতে হতে পারে।

ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর এবং আইটু-ইউটু-টু জোটের মতো উদ্যোগ ইতোমধ্যে আঞ্চলিক সংকটের কারণে পিছিয়ে গেছে। এগুলো পুনরুজ্জীবিত করা সহজ হবে না বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।
নিরপেক্ষতা কি টেকসই থাকবে
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, পক্ষ নেওয়া এ ধরনের সংঘাতে সমাধান আনে না। তাঁদের মতে, নীরব কূটনীতি ও সংলাপই কার্যকর পথ। দিল্লির লক্ষ্য ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা।
অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন ইরান কার্যত একা লড়াই করছে এবং ভারতের নিরপেক্ষ অবস্থান তেহরানের কাছে সন্তোষজনক নাও হতে পারে। তবে বাস্তবতার নিরিখে ইরানের বিকল্প খুব সীমিত।

ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির মৃত্যুর পর আকাশপথে হামলা আরও বাড়বে নাকি থেমে যাবে, তা পর্যবেক্ষণ করছে ভারতসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত হওয়ায় এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
শেষ পর্যন্ত দিল্লি হয়তো হিসাব করবে, ইসরায়েলের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করা আঞ্চলিক বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বেশি লাভজনক কি না। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















