বিশ্ব অর্থনীতি যখন একাধিক সংকটের মুখে, ঠিক সেই সময় আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক বছর আগে বলেছিলেন— ‘আমেরিকা ফার্স্ট মানে আমেরিকা একা নয়।’ কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বৈঠকে উপস্থিত একাধিক দেশের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়েও যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ পুরোপুরি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দিকে নেই। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বৈঠকের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ নিয়ে অসন্তোষ দেখা গেছে।
আলোচনায় অনাগ্রহ, বড় ইস্যুতে নীরবতা
অনেকের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো—বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং এর ফলে সৃষ্ট তেলের মূল্যবৃদ্ধি—নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি। ইউরোপ ও এশিয়ার জন্য এই পরিস্থিতি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
সুইডেনের অর্থমন্ত্রী এলিজাবেথ সভান্টেসন সরাসরি মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান অন্য দেশগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। একইভাবে যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভসও সংঘাতের উদ্দেশ্য নিয়ে অস্পষ্টতার সমালোচনা করেছেন।

হরমুজ প্রণালী ও বাজারের অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালী নিয়ে অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। যদিও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে এবং ইরান প্রণালী খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, তবুও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
এই অনিশ্চয়তার কারণে তেলের দাম ওঠানামা করছে, শেয়ারবাজারেও দেখা যাচ্ছে অস্থিরতা। অনেক নীতিনির্ধারক মনে করছেন, এর প্রভাব আরও কয়েক মাস ধরে থাকতে পারে।
ইউরোপের বাড়তি ঝুঁকি
ইউরোপের অর্থনীতি এই সংকটে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে ইউরোপের কিছু দেশে বিমান জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। জার্মানির বিমান সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
জার্মান অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবেইল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সংঘাতের মূল্যায়নে মতপার্থক্য রয়েছে এবং তা খোলামেলাভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও ব্যাখ্যা
অন্যদিকে জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাটায়ামা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে কিছুটা সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, বেসেন্ট বৈঠকের শুরুতে সক্রিয় ছিলেন এবং ইরানের ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জোরদারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
তবে বৈঠকে অনুপস্থিতি বা সীমিত অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক থেকেই গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থমন্ত্রী ইনোক গডংওয়ানা মনে করেন, এমন বৈঠকে সভাপতিত্বকারী দেশের পূর্ণ উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দে জোর দিয়ে বলেছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা আরও বেশি জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আগের মতো নেতৃত্ব দিচ্ছে না, তবে বৈশ্বিক সংলাপের গুরুত্ব এখনো অটুট। ফরাসি অর্থনীতিবিদ ইসাবেল মাতেওস ই লাগো মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলের সঙ্গে অন্যান্য দেশগুলোকে মানিয়ে নিতে হবে।

সংকট মোকাবিলায় ভবিষ্যৎ পথ
মার্কিন প্রশাসন দাবি করছে, তারা সংঘাত নিরসনে কাজ করছে এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক। সাম্প্রতিক বাজার প্রবণতাও কিছুটা সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে সামগ্রিক চিত্র বলছে, বিশ্ব অর্থনীতির এই অনিশ্চিত সময়ে আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও স্পষ্ট নেতৃত্বের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















