জাপানের তরুণ রাজকুমারী আইকো—মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা, সহমর্মিতা ও সহজ স্বভাবের জন্য যিনি দ্রুতই এক বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছেন। দেশের বিভিন্ন শহরে তাঁর সফর মানেই জনতার ঢল। অনেকেই আশা করছেন, একদিন তিনি জাপানের সম্রাজ্ঞী হবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমান আইন সেই পথকে বন্ধ করে রেখেছে।
জনপ্রিয়তার শীর্ষে আইকো
গত বছর নিগাতা শহরে একক সফরে গেলে শত শত মানুষ স্টেশনে ভিড় করেন শুধুমাত্র তাঁকে এক ঝলক দেখার জন্য। এই উচ্ছ্বাসকে স্থানীয় গণমাধ্যম “আইকো জ্বর” বলে উল্লেখ করেছে। ২৪ বছর বয়সী এই রাজকুমারীকে অনেকেই জনগণের কাছাকাছি থাকা একজন আন্তরিক মানুষ হিসেবে দেখেন।
এই জনপ্রিয়তাই অনেকের মধ্যে আশা জাগিয়েছে—তিনি একদিন তাঁর বাবা সম্রাট নারুহিতোর মতো রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতীকী দায়িত্ব পালন করবেন। যদিও জাপানের সম্রাটের ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক, তবুও এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক।
আইনের বাধা: নারী উত্তরাধিকার নিষিদ্ধ
তবে জাপানের ১৯৪৭ সালের রাজপরিবার আইন অনুযায়ী, কেবল পুরুষ উত্তরাধিকারীরাই সিংহাসনে বসতে পারেন। ফলে আইকোর জন্য সম্রাজ্ঞী হওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি তিনি বিয়ে করলে রাজপরিবারের সদস্যপদও হারাবেন এবং সাধারণ নাগরিক হয়ে যাবেন।
বর্তমানে সিংহাসনের উত্তরাধিকার ক্রমে রয়েছেন যুবরাজ আকিশিনো, তাঁর ছেলে প্রিন্স হিসাহিতো এবং প্রবীণ প্রিন্স হিতাচি। নতুন প্রজন্মে একমাত্র পুরুষ উত্তরাধিকারী হিসাহিতোই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।
ইতিহাসে নারী সম্রাট ছিল
জাপানের ইতিহাসে নারী সম্রাটের নজির আছে। মোট আটজন নারী সম্রাট অতীতে দায়িত্ব পালন করেছেন, যদিও তা ছিল সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে—পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকা পর্যন্ত। ষষ্ঠ শতকের সম্রাজ্ঞী সুইকো ছিলেন প্রথম, আর সর্বশেষ ছিলেন আঠারো শতকের সম্রাজ্ঞী গো-সাকুরামাচি।
অন্যদিকে ইউরোপের অনেক দেশে এখন প্রথম সন্তানই উত্তরাধিকারী হন, ছেলে বা মেয়ে—এই বিভাজন নেই।
সংসদে ভিন্নমত ও জনমত
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ নারী সম্রাটের পক্ষে। প্রায় ৬১ শতাংশ মানুষ এ ধারণাকে সমর্থন করেছেন। বিরোধী রাজনৈতিক নেতারাও নারী সম্রাটের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে সরকার ও রক্ষণশীল রাজনীতিকদের মধ্যে এ বিষয়ে অনীহা স্পষ্ট। তারা মনে করেন, এই পরিবর্তন বর্তমান উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে অস্থির করে তুলতে পারে।
রাজপরিবার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা
বর্তমানে জাপানের রাজপরিবারে সদস্য সংখ্যা মাত্র ১৬ জন। এর মধ্যে পাঁচজন অবিবাহিত নারী। আইন পরিবর্তন না হলে বিয়ের পর তারা রাজপরিবার ছাড়বেন, ফলে সদস্য সংখ্যা আরও কমে যাবে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দুটি প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে—বিয়ের পর নারীদের রাজপরিবারে রাখার সুযোগ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাধারণ নাগরিক হয়ে যাওয়া পুরনো রাজপরিবারের পুরুষ সদস্যদের পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা।
রাজনীতি ও রক্ষণশীল মানসিকতা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিষয়টি কেবল আইনি নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক। রক্ষণশীল গোষ্ঠী এখনো পুরুষতান্ত্রিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে চায়। তারা মনে করে, নারী উত্তরাধিকার চালু হলে ভবিষ্যতে পুরো ব্যবস্থাই বদলে যাবে।
এছাড়া, দেশের প্রাচীন রাজতন্ত্রের গর্ব বজায় রাখার বিষয়টিও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আবারও পুরোনো বিতর্ক
দুই দশক আগে একই বিতর্ক সামনে আসে, যখন রাজপরিবারে শুধুই কন্যা সন্তান ছিল। তখন আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০০৬ সালে প্রিন্স হিসাহিতোর জন্মের পর সেই উদ্যোগ থেমে যায়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুবরাজ আকিশিনোর পরিবারের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় আবারও আইকোকে নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
সংসদে আলোচনা চললেও এখনই নারী সম্রাটের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। যদি আইন পরিবর্তন না হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও পুরুষ উত্তরাধিকারীর জন্য চাপ তৈরি হবে, যা রাজপরিবারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজপরিবার সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে—সাধারণ পরিবারের সদস্যদের বিয়ে করা থেকে শুরু করে সম্রাটের ভূমিকা বদল পর্যন্ত। তাই অনেকেই মনে করেন, সময়ের দাবি মেনে উত্তরাধিকার ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা উচিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















