মানুষের সম্পর্ক কখনো শুধু ভালোবাসার নয়, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে ক্ষোভ, অহং আর নিঃশব্দ সহিংসতা—এই কঠিন বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে ‘এভরিবডি লাভস সোহরাব হান্ডা’। এটি একদিকে যেমন খুনের রহস্য, অন্যদিকে তেমনি সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ততার এক তীক্ষ্ণ প্রতিচ্ছবি।
গল্পের শুরু হয় এক শান্ত, উদযাপনের পরিবেশে। দশম বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে রমন ও জয়ন্তী তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পাহাড়ি একটি পুরনো প্রাসাদে আয়োজন করেন বিশেষ এক জমায়েত। হাসি-আড্ডা, স্মৃতি আর আনন্দে ভরা সেই রাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন রমনের ব্যবসায়িক অংশীদার সোহরাব হান্ডা—তীক্ষ্ণভাষী, নির্লজ্জভাবে স্পষ্টভাষী এবং অন্যদের দুর্বলতায় আঘাত করতে পারদর্শী এক ব্যক্তি।
হাসির আড়ালে জমে ওঠা অস্বস্তি
শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ধীরে ধীরে উঠে আসে সম্পর্কের ভেতরের চাপা উত্তেজনা। সোহরাবের কথাবার্তা, তার কটাক্ষ আর আচরণ অন্যদের ভেতরের ক্ষতকে উসকে দেয়। হাসির আড়ালে জমতে থাকে অস্বস্তি, পুরনো ক্ষোভ আর অব্যক্ত দ্বন্দ্ব।
খুনের ঘটনায় ভেঙে পড়ে সভ্যতার মুখোশ
রাতের শেষভাগে ঘটে যায় চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা—সোহরাবকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত। এই এক মুহূর্তেই বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি। যাদের এতক্ষণ বন্ধু মনে হচ্ছিল, তারাই হয়ে ওঠে সন্দেহভাজন। সামনে আসে প্রশ্ন—কে তাকে হত্যা করল, আর কেন?
মানসিক দ্বন্দ্বের উন্মোচন
তদন্ত শুরু হলে একে একে বেরিয়ে আসে প্রত্যেকের ভেতরের সত্য। একজন দার্শনিক অধ্যাপক, একজন মনোবিজ্ঞানী, একজন সাংবাদিক—সবাই যেন নিজেদের মুখোশ খুলতে বাধ্য হয়। কথোপকথনের মধ্য দিয়ে উঠে আসে সমাজের ভণ্ডামি, ব্যক্তিগত হতাশা আর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা।
এই গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি শুধু খুনের রহস্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং দেখায় কীভাবে ভালোবাসার সম্পর্কের ভেতরেও ঘৃণা ও সহিংসতা বাসা বাঁধতে পারে। যখন একজন আক্রমণাত্মক মানুষকে সমাজ সহ্য করে বা প্রশ্রয় দেয়, তখন সেই আচরণ ধীরে ধীরে অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।

চরিত্র ও অভিনয়ের শক্তি
চরিত্রগুলোর পারস্পরিক টানাপোড়েন ও সংলাপ গল্পকে করে তোলে জীবন্ত ও বাস্তব। দীর্ঘদিনের পরিচিত অভিনেতাদের সমন্বয়ে গড়া এই দল একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে, তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন খুব স্বাভাবিক মনে হয়। একজন সহনশীল স্ত্রী, একজন স্বাধীনতা খুঁজতে থাকা সাধারণ নারী—প্রতিটি চরিত্রই গল্পে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
চিত্রনির্মাণে গতি ও আবহ
ক্যামেরার মসৃণ চলন, শব্দের সূক্ষ্ম ব্যবহার এবং সংযত সংগীত পুরো গল্পে তৈরি করে এক অস্বস্তিকর অথচ আকর্ষণীয় আবহ। তবে গল্পের দ্বিতীয়ার্ধে রহস্যের দিকটি কিছুটা ঢিলে হয়ে যায়, কারণ নির্মাতা বেশি মনোযোগ দেন মানসিক বিশ্লেষণে।
তবুও, এই গল্পের মূল শক্তি তার সাহসী প্রশ্নে—আমরা যাদের ভালোবাসি, তাদের প্রতিই কি আমরা সবচেয়ে বেশি আঘাত করি?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















