০৫:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনে এলো আরও ৫ হাজার টন ডিজেল, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের উদ্যোগ হজ ফ্লাইট উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আগামী বছর খরচ আরও কমানোর প্রতিশ্রুতি বিশ্বব্যাংকের উদ্যোক্তা তৈরির পরীক্ষায় ব্যর্থতা: ঘানায় আচরণগত পরিবর্তনের কৌশল কেন কাজ করল না প্রোটিনের দামে চাপ, নিম্নবিত্ত শিশুদের পাতে সংকট: পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়ছে বিগত দুই সরকারের গাফিলতির কারণে হাম ছড়িয়ে পড়েছে—প্রধানমন্ত্রী, ২০১০–২০২৩-এ ৮০% থেকে ৯০%+ শিশুকে হামের টিকা দেয়া হয় গিলের ব্যাটে ঝলক, টানা তিন জয়ে উড়ছে গুজরাট—কেকেআরকে হারিয়ে পয়েন্ট তালিকায় বড় লাফ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাড়ছে হামের প্রকোপ, ২৪ ঘণ্টায় আরও ২১ জন হাসপাতালে রাজকুমারী আইকো কেন সম্রাজ্ঞী হতে পারছেন না: জনপ্রিয়তা বাড়লেও আইনের বাঁধা তামিলনাড়ু নির্বাচনে এক মঞ্চে দেখা নাও যেতে পারে স্ট্যালিন-রাহুল, জোটে আলাদা প্রচারেই জোর রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর ২০২৫: সাগরে নিখোঁজ বা নিহত প্রায় ৯০০, বিপদজনক যাত্রা থামছেই না

ভারতের জ্বালানি পরিকল্পনায় ইথানল প্রকল্প: গ্রামাঞ্চলে পানি সংকটের আশঙ্কায় বিক্ষোভ

ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও তেলের আমদানি কমানোর লক্ষ্যে ইথানল উৎপাদনকে কেন্দ্র করে যে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা এখন গ্রামাঞ্চলে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, এই প্রকল্প তাদের পানি, জমি ও স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

জ্বালানি নিরাপত্তা বনাম স্থানীয় উদ্বেগ
ভারত বর্তমানে তার তেল ও গ্যাসের প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়ায় সরকার বিকল্প হিসেবে ইথানলকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০১৪ সালে পেট্রোলে ইথানল মিশ্রণের হার যেখানে ছিল মাত্র ১ শতাংশ, তা গত বছর বেড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে।

কিন্তু এই ইথানল মূলত ভুট্টা ও আখ থেকে তৈরি হয়, যা উৎপাদনে প্রচুর পানি ও জমির প্রয়োজন। ফলে গ্রামীণ এলাকায় এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

India's Ethanol Ambitions: A Signal to Turn Toward GM Corn Imports? India's ethanol blending program, once celebrated as a green energy milestone, is heading into uncharted and contentious… | Deepak Pareek | 16 comments

 

রাজস্থানে বিক্ষোভের বিস্তার
রাজস্থানের টিব্বি নামের একটি ছোট শহরে প্রস্তাবিত একটি ইথানল কারখানাকে ঘিরে শত শত কৃষক বিক্ষোভে নেমেছেন। তাদের অভিযোগ, এই প্রকল্প শুরু করার আগে স্থানীয়দের মতামত নেওয়া হয়নি।

একজন কৃষক জানান, কারখানাটি তাদের ভূগর্ভস্থ পানি শুষে নেবে। গত বছর ভারী যন্ত্রপাতি এসে গভীর খনন শুরু করার পরই তারা বিষয়টি বুঝতে পারেন। এরপর থেকেই ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

পাঞ্জাবের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্কতা
টিব্বির বাসিন্দারা পাশের পাঞ্জাব রাজ্যে গিয়ে একটি ইথানল কারখানার প্রভাব সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। সেখানে স্থানীয়দের দাবি, কারখানার কারণে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হয় এবং মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে।

এরপর পাঞ্জাবে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত একটি কারখানা বন্ধও হয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতা টিব্বির বাসিন্দাদের আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

পানি ও জমির ওপর চাপের আশঙ্কা
টিব্বি এলাকার মানুষ বলছেন, তাদের অঞ্চলে সেচের জন্য খাল ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। ইতিমধ্যে পানির স্তর কমে যাচ্ছে, তার ওপর নতুন কারখানা এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

তাদের মতে, এই প্রকল্প কৃষিকাজের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি করবে এবং পানি দূষণের ঝুঁকি বাড়াবে।

India's ethanol drive imperils its push for edible oil self-sufficiency | Reuters

নীতিগত ছাড় ও স্থানীয়দের অসন্তোষ
২০২১ সালের একটি নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার কিছু ইথানল কারখানাকে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও জনশুনানি ছাড়াই অনুমোদনের সুযোগ দিয়েছে, যদি তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে।

যদিও এসব কারখানায় শূন্য তরল বর্জ্য ব্যবস্থার কথা বলা হয়, স্থানীয়দের দাবি—এই নিয়ম বাস্তবে সবসময় মানা হয় না। পাঞ্জাবের ঘটনায় অবৈধভাবে বর্জ্য ভূগর্ভে ফেলার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

জমি ও খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে ইথানল উৎপাদন বাড়াতে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৮ মিলিয়ন হেক্টর জমি প্রয়োজন হতে পারে। এতে খাদ্যশস্যের সঙ্গে জ্বালানির জন্য ফসল উৎপাদনের প্রতিযোগিতা বাড়বে।

এছাড়া, আখ, ভুট্টা ও চালের বড় অংশ জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহৃত হওয়ায় মানুষের খাদ্য ও পশুখাদ্যের সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে।

পরিবেশগত দ্বন্দ্ব
গবেষণায় দেখা গেছে, ইথানল উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ নির্গমন হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যবহারের চেয়েও বেশি হতে পারে। ফলে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে ইথানলের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

উন্নয়ন বনাম জীবনযাত্রার নিরাপত্তা
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিক্ষোভ শুধু একটি প্রকল্পের বিরুদ্ধে নয়, বরং স্থানীয় জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া।

গ্রামবাসীদের বক্তব্য পরিষ্কার—তারা উন্নয়নের বিরোধী নন, কিন্তু এমন উন্নয়ন চান না যা তাদের জমি, পানি ও স্বাস্থ্যকে বিপন্ন করে।

ভারতের ইথানল প্রকল্প তাই এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখে—একদিকে জলবায়ু ও জ্বালানি লক্ষ্য, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনে এলো আরও ৫ হাজার টন ডিজেল, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের উদ্যোগ

ভারতের জ্বালানি পরিকল্পনায় ইথানল প্রকল্প: গ্রামাঞ্চলে পানি সংকটের আশঙ্কায় বিক্ষোভ

০৪:০৪:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও তেলের আমদানি কমানোর লক্ষ্যে ইথানল উৎপাদনকে কেন্দ্র করে যে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা এখন গ্রামাঞ্চলে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, এই প্রকল্প তাদের পানি, জমি ও স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

জ্বালানি নিরাপত্তা বনাম স্থানীয় উদ্বেগ
ভারত বর্তমানে তার তেল ও গ্যাসের প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়ায় সরকার বিকল্প হিসেবে ইথানলকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০১৪ সালে পেট্রোলে ইথানল মিশ্রণের হার যেখানে ছিল মাত্র ১ শতাংশ, তা গত বছর বেড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে।

কিন্তু এই ইথানল মূলত ভুট্টা ও আখ থেকে তৈরি হয়, যা উৎপাদনে প্রচুর পানি ও জমির প্রয়োজন। ফলে গ্রামীণ এলাকায় এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

India's Ethanol Ambitions: A Signal to Turn Toward GM Corn Imports? India's ethanol blending program, once celebrated as a green energy milestone, is heading into uncharted and contentious… | Deepak Pareek | 16 comments

 

রাজস্থানে বিক্ষোভের বিস্তার
রাজস্থানের টিব্বি নামের একটি ছোট শহরে প্রস্তাবিত একটি ইথানল কারখানাকে ঘিরে শত শত কৃষক বিক্ষোভে নেমেছেন। তাদের অভিযোগ, এই প্রকল্প শুরু করার আগে স্থানীয়দের মতামত নেওয়া হয়নি।

একজন কৃষক জানান, কারখানাটি তাদের ভূগর্ভস্থ পানি শুষে নেবে। গত বছর ভারী যন্ত্রপাতি এসে গভীর খনন শুরু করার পরই তারা বিষয়টি বুঝতে পারেন। এরপর থেকেই ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

পাঞ্জাবের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্কতা
টিব্বির বাসিন্দারা পাশের পাঞ্জাব রাজ্যে গিয়ে একটি ইথানল কারখানার প্রভাব সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। সেখানে স্থানীয়দের দাবি, কারখানার কারণে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হয় এবং মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে।

এরপর পাঞ্জাবে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত একটি কারখানা বন্ধও হয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতা টিব্বির বাসিন্দাদের আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

পানি ও জমির ওপর চাপের আশঙ্কা
টিব্বি এলাকার মানুষ বলছেন, তাদের অঞ্চলে সেচের জন্য খাল ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। ইতিমধ্যে পানির স্তর কমে যাচ্ছে, তার ওপর নতুন কারখানা এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

তাদের মতে, এই প্রকল্প কৃষিকাজের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি করবে এবং পানি দূষণের ঝুঁকি বাড়াবে।

India's ethanol drive imperils its push for edible oil self-sufficiency | Reuters

নীতিগত ছাড় ও স্থানীয়দের অসন্তোষ
২০২১ সালের একটি নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকার কিছু ইথানল কারখানাকে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও জনশুনানি ছাড়াই অনুমোদনের সুযোগ দিয়েছে, যদি তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে।

যদিও এসব কারখানায় শূন্য তরল বর্জ্য ব্যবস্থার কথা বলা হয়, স্থানীয়দের দাবি—এই নিয়ম বাস্তবে সবসময় মানা হয় না। পাঞ্জাবের ঘটনায় অবৈধভাবে বর্জ্য ভূগর্ভে ফেলার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

জমি ও খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে ইথানল উৎপাদন বাড়াতে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৮ মিলিয়ন হেক্টর জমি প্রয়োজন হতে পারে। এতে খাদ্যশস্যের সঙ্গে জ্বালানির জন্য ফসল উৎপাদনের প্রতিযোগিতা বাড়বে।

এছাড়া, আখ, ভুট্টা ও চালের বড় অংশ জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহৃত হওয়ায় মানুষের খাদ্য ও পশুখাদ্যের সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে।

পরিবেশগত দ্বন্দ্ব
গবেষণায় দেখা গেছে, ইথানল উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ নির্গমন হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যবহারের চেয়েও বেশি হতে পারে। ফলে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে ইথানলের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

উন্নয়ন বনাম জীবনযাত্রার নিরাপত্তা
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিক্ষোভ শুধু একটি প্রকল্পের বিরুদ্ধে নয়, বরং স্থানীয় জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া।

গ্রামবাসীদের বক্তব্য পরিষ্কার—তারা উন্নয়নের বিরোধী নন, কিন্তু এমন উন্নয়ন চান না যা তাদের জমি, পানি ও স্বাস্থ্যকে বিপন্ন করে।

ভারতের ইথানল প্রকল্প তাই এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখে—একদিকে জলবায়ু ও জ্বালানি লক্ষ্য, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা।