মঙ্গোলিয়ার প্রত্যন্ত আলতাই পর্বতমালায় আজও কাজাখ শিকারিরা সোনালি ঈগল নিয়ে শিকারে বের হন। এখানে প্রকৃতি, বেঁচে থাকা এবং শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
শীতের শেষভাগ। বিস্তীর্ণ উপত্যকাজুড়ে বাদামি রঙের ভূমি, কোথাও কোথাও বরফের আস্তরণ। দূরে তুষারঢাকা পর্বতচূড়া আর মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা সরু নদী। এই পরিবেশেই ১২ বছর বয়সী আয়কেরিম ঘোড়ার পিঠে চড়ে এগিয়ে যায়। খালি পিঠে ঘোড়া চালানোর দক্ষতা তার কাছে যেন একেবারেই স্বাভাবিক ব্যাপার।
তার সঙ্গে আছে ১৮ বছর বয়সী বাউরলাস। তার হাতে বসে আছে একটি সোনালি ঈগল। তারা পাহাড়ের ঢালে উঠে নিচের প্রান্তর পর্যবেক্ষণ করে শিয়াল বা অন্য শিকারের খোঁজে। হঠাৎ ঈগলটি একটি দৌড়ে পালানো শিয়াল দেখতে পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই শিকারকে ধরে ফেলে। তবে শিয়ালের চামড়া অক্ষত রাখতে বাউরলাস ঈগলটিকে মাংস দেখিয়ে সরিয়ে নেয়, আর আহত শিয়ালটি পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
আয়কেরিম ও বাউরলাসের পরিবার পশ্চিম মঙ্গোলিয়ার বায়ান-উলগি অঞ্চলের আধা-যাযাবর কাজাখ পশুপালক সম্প্রদায়ের অংশ। এই অঞ্চলটি মঙ্গোলিয়া, চীন ও রাশিয়ার সীমান্তসংলগ্ন, আর কাছেই রয়েছে কাজাখস্তান।

কাজাখ সংস্কৃতিতে ঈগল শিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে। যেসব শিকারি ঈগল নিয়ে শিকার করেন, তাদের বলা হয় ‘বারকুতচি’। ঈগল ও শিকারির মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে দীর্ঘ সময়ের ধৈর্য, যত্ন ও পারস্পরিক বিশ্বাসের মাধ্যমে। সোনালি ঈগলকে শুধু শিকারি পাখি নয়, বরং একজন সঙ্গী হিসেবেও দেখা হয়।
একসময় এই ঐতিহ্য মূলত বাবা থেকে ছেলের কাছে হস্তান্তর হতো। কিন্তু এখন মেয়েরাও এতে অংশ নিচ্ছে। আয়কেরিমের মতো কিশোরীরা ঈগল প্রশিক্ষণ ও শিকারের কৌশল শিখছে, যা এই ঐতিহ্যের ধারাকে নতুন রূপ দিচ্ছে।
ঈগল প্রশিক্ষণের কাজ শুরু হয় খুব অল্প বয়স থেকেই। পাহাড়ি খাড়া পাথুরে স্থান থেকে ছানা সংগ্রহ করা হয় অথবা জালে ধরা হয়। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়। প্রতিদিন ঈগলের মাথা ও বুক স্পর্শ করে তাকে মানুষের সঙ্গে অভ্যস্ত করা হয়। শিকারিদের মতে, বিশ্বাস কখনো জোর করে আদায় করা যায় না; এটি সময়ের সঙ্গে অর্জন করতে হয়।
ঈগলদের খাবারও নিয়ন্ত্রিতভাবে দেওয়া হয়। শিকারিরা কাঁচা মাংসের রক্ত ধুয়ে ফেলে যাতে পাখির ওজন ও ক্ষুধা শিকারের উপযোগী পর্যায়ে থাকে। এই সম্পর্ক পারস্পরিক নির্ভরতার—ঈগল খাদ্য ও যত্নের জন্য শিকারির ওপর নির্ভর করে, আর শিকারি নির্ভর করে ঈগলের দৃষ্টি, গতি ও শক্তির ওপর।
আলতাই অঞ্চলের শীত অত্যন্ত কঠোর। অনেক সময় তাপমাত্রা মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়। পরিবারগুলো পশুপালন, পাহাড় থেকে বরফ এনে পানি সংগ্রহ, জ্বালানির জন্য গোবর ও কাঠ জোগাড় এবং ঘোড়ার যত্নে ব্যস্ত থাকে। এখানে ঘোড়া শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়, বরং পরিচয় ও টিকে থাকার অংশ।
তবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনও আসছে। আগে যেখানে যাতায়াতের জন্য পুরোপুরি ঘোড়ার ওপর নির্ভরতা ছিল, এখন মোটরসাইকেল জনপ্রিয় হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোনও ধীরে ধীরে গ্রামীণ জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের শহরের বোর্ডিং স্কুলে পাঠাচ্ছে, যা নতুন সুযোগ তৈরি করলেও ঐতিহ্য থেকে দূরত্বও সৃষ্টি করছে।

তবুও সবাই পাহাড় ছেড়ে যেতে চায় না। অনেক তরুণ এখনো পশুপালক হিসেবে জীবন বেছে নিচ্ছে এবং শীতকালে ঈগল নিয়ে শিকারে অংশ নিচ্ছে। তবে বর্তমানে অনেকের কাছে এটি আর শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়; বরং একটি ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটনও এই সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উলগি শহরের বার্ষিক ঈগল উৎসব দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা আসেন। এতে স্থানীয় পরিবারগুলোর আয়ের নতুন উৎস তৈরি হয়েছে। তবে এর ফলে ঐতিহ্যের উপস্থাপন ও বাস্তবতার মধ্যে নতুন প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
কাজাখ ঐতিহ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর একসঙ্গে কাজ করার পর ঈগলকে আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। শিকারি একা পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে ঈগলের মাথার আবরণ খুলে তাকে মুক্ত করে দেয়। এটি কৃতজ্ঞতা, সম্মান এবং বিদায়ের প্রতীক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরপর আর সেই ঈগলের সঙ্গে দেখা হয় না।
আলতাইয়ের এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে ঈগল আকাশের প্রতীক হলেও, ঘোড়াই এখনো শিকারি ও ঐতিহ্যকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে চলেছে। আর সেই কারণেই এই সংস্কৃতি আজও জীবন্ত, পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের শিকড় আঁকড়ে ধরে আছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















