ভারতের কৃষিখাতে বহুল ব্যবহৃত আগাছানাশক প্যারাকোয়াট নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অত্যন্ত বিষাক্ত এই রাসায়নিকের কারণে প্রতিবছর শত শত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আত্মহত্যার ঘটনা ছাড়াও অসাবধানতাবশত পান বা ব্যবহারের ফলে বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।
তেলেঙ্গানার সাহসী পদক্ষেপ
সম্প্রতি তেলেঙ্গানা সরকার প্যারাকোয়াটের বিক্রি, বিতরণ, উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। এর আগে কেবল কেরালা ও ওডিশা একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের দীর্ঘদিনের দাবির পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে প্রতিবেশী অন্ধ্র প্রদেশও একই পথে হাঁটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যারাকোয়াট সহজলভ্য, তুলনামূলক সস্তা এবং কৃষিক্ষেত্রে কার্যকর হওয়ায় এর ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু এর বিষক্রিয়া এতটাই মারাত্মক যে একবার শরীরে প্রবেশ করলে রোগীকে বাঁচানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

ভুল করে পান, তারপর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই
তেলেঙ্গানার এক ব্যক্তি ভুলবশত প্যারাকোয়াট পান করে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। পরিবারের সদস্যরা আগাছানাশকটি একটি পানীয়ের বোতলে সংরক্ষণ করেছিলেন। সেটিকেই ভুল করে ফ্রিজে রাখা হয়। পরে তিনি তা পান করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বাঁচলেও আজও তিনি শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসকদের ভাষায়, প্যারাকোয়াট ফুসফুস, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় কেন
শ্রমিক সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক কৃষক প্যারাকোয়াট ব্যবহার করেন। এটি দ্রুত আগাছা পরিষ্কার করতে সক্ষম হওয়ায় কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে এর আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
তবে কৃষি বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, যথাযথ তদারকি ও সচেতনতার অভাবে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ফলে দুর্ঘটনাজনিত বিষক্রিয়ার ঘটনাও বাড়ছে।
হাসপাতালগুলোতে উদ্বেগজনক চিত্র

হায়দরাবাদের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা উদ্বেগজনক। এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুই বছরে একটি হাসপাতালেই ২১৭টি প্যারাকোয়াট-সম্পর্কিত মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই কৃষক, আর উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষার্থী।
চিকিৎসকদের মতে, এই বিষের কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষেধক নেই। রোগীকে কেবল সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রেই কিডনি, যকৃত ও ফুসফুস দ্রুত বিকল হয়ে যায় এবং রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।
বিশ্বজুড়ে নিষেধাজ্ঞা, ভারতে বিতর্ক
বিশ্বের ৭৪টি দেশে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ। তবু ভারতে এটি এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য সংগঠন ও চিকিৎসকরা দেশজুড়ে নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, অনলাইন ও অফলাইন বাজার থেকে এই রাসায়নিক পুরোপুরি সরিয়ে না দিলে মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হবে।
অন্যদিকে কৃষি খাতের কিছু সংগঠন বলছে, হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
নিষেধাজ্ঞার ইতিবাচক প্রভাব
তেলেঙ্গানায় নিষেধাজ্ঞার পর প্যারাকোয়াটজনিত মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। তাদের মতে, দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে আরও বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















