গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের প্রতিবাদকে ঘিরে একটি অদ্ভুত প্রবণতা ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। যখনই মানুষ রাস্তায় নামে, প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে—তাদের দাবি কতটা যৌক্তিক, আন্দোলনের পদ্ধতি কতটা গ্রহণযোগ্য, কিংবা আদৌ তারা প্রতিবাদ করার নৈতিক অধিকার রাখে কি না। অথচ একই সময়ে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া—ব্যারিকেড, লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস কিংবা ব্যাপক আটক—প্রায় কখনোই একই মাত্রায় প্রশ্নবিদ্ধ হয় না। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে প্রতিবাদকারী, রাষ্ট্র নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, সাংবিধানিকভাবেও ভুল। গণতন্ত্রে নাগরিকের মতপ্রকাশ, সমাবেশ এবং ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাই কোনো প্রতিবাদকে দমন করার সিদ্ধান্ত নিলে, তার যুক্তি এবং প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করার দায় রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। নাগরিককে তার স্বাধীনতার কারণ প্রমাণ করতে হয় না; বরং সেই স্বাধীনতা সীমিত করার কারণ রাষ্ট্রকেই দেখাতে হয়।
ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(ক) ও ১৯(১)(খ) অনুচ্ছেদ নাগরিককে মতপ্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার দিয়েছে। একই সঙ্গে ১৪ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেয় এবং ২১ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এই বিধানগুলো একসঙ্গে পড়লে স্পষ্ট হয়, সংবিধান এমন একটি রাষ্ট্র কল্পনা করেছে যেখানে মানুষ শুধু নিজের মত পোষণই করবে না, বরং তা প্রকাশ এবং সংগঠিতভাবেও তুলে ধরতে পারবে।
এটি কোনো কাকতালীয় সাংবিধানিক বিন্যাস নয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসই এই ধারণার ভিত্তি নির্মাণ করেছে। ঔপনিবেশিক শাসনের সময় জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, লবণ সত্যাগ্রহ কিংবা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মতো ঘটনায় জনগণ দেখেছিল কীভাবে রাষ্ট্রের শক্তি নাগরিকের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সংবিধান প্রণেতারা মৌলিক অধিকারকে রাষ্ট্রের দান হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর আরোপিত সীমারেখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
কিন্তু স্বাধীনতার পরও সেই মানসিকতার সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটেনি। জরুরি অবস্থা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের দমনমূলক প্রবণতার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়, তবে সেটিই একমাত্র উদাহরণ নয়। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, সাংবাদিক এবং সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার বারবার দেখা গেছে। ফলে আদালতকে বহুবার হস্তক্ষেপ করে রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিতে হয়েছে যে, সংবিধান কোনো সরকারকে সীমাহীন ক্ষমতা দেয়নি।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায় এই নীতিকে আরও সুসংহত করেছে। ১৯৭৩ সালের হিমত লাল কে. শাহ মামলায় আদালত স্পষ্ট জানিয়েছিল, সরকার জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু সেই অধিকার সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নিতে পারে না। ২০১৬ সালের অনিতা ঠাকুর মামলায় পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের স্বীকৃতি দিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। ২০১২ সালের রামলীলা ময়দান ঘটনার পর আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে হস্তক্ষেপ করে পুলিশি অভিযানকে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। একই সঙ্গে আদালত বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘প্রয়োজনীয়তা’ ও ‘সমানুপাতিকতার’ নীতি অনুসরণের বাধ্যবাধকতার ওপর জোর দেয়। ২০১৮ সালের মজদুর কিষান শক্তি সংগঠন মামলায়ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে সাংবিধানিক সুরক্ষাপ্রাপ্ত অধিকার হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
এছাড়া ডি. কে. বসু বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মামলার ঐতিহাসিক রায় পুলিশি ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যদিও মামলাটি মূলত হেফাজতে নির্যাতন নিয়ে ছিল, তবুও এর নির্দেশনাগুলো জনসমাবেশে পুলিশি পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। গ্রেপ্তারকারী কর্মকর্তার পরিচয় স্পষ্ট থাকতে হবে, গ্রেপ্তারের নথি প্রস্তুত করতে হবে, পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠজনকে দ্রুত জানাতে হবে, আটক ব্যক্তির অবস্থান প্রকাশ করতে হবে, চিকিৎসা পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে। এগুলো প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এগুলো নাগরিক স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষা।
সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির বিভিন্ন প্রতিবাদের যেসব দৃশ্য সামনে এসেছে, তা এই সাংবিধানিক সীমারেখা কত সহজে উপেক্ষিত হতে পারে, তার উদ্বেগজনক ইঙ্গিত দেয়। আহত মানুষ, রক্তাক্ত মাথা, ভাঙা অঙ্গ কিংবা পেলেট গানের আঘাত—এসব কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় শারীরিক ক্ষতি নয়। যখন রাষ্ট্র আইনের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে এমন আঘাত করে, তখন তা সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়। কারণ রাষ্ট্রের প্রতিটি লাঠিচার্জ, প্রতিটি আটক এবং প্রতিটি বলপ্রয়োগ সংবিধানের আলোকে বিচারযোগ্য।
এখন এই ঘটনাগুলো নিয়ে দিল্লি হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে শুনানি চলছে। আদালতের সামনে প্রশ্ন নতুন নয়; বরং বহু প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক নীতির বাস্তব প্রয়োগের বিষয়। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেও আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, কোনো আন্দোলনই রাষ্ট্রকে সীমাহীন শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেয় না। তবে শুধু নীতিগত মন্তব্য যথেষ্ট নয়। যদি অভিযোগ একাধিক শহরে, বহু প্রত্যক্ষদর্শীর উপস্থিতিতে এবং বিভিন্ন ভিডিও প্রমাণের মাধ্যমে উঠে আসে, তাহলে আদালতকে নির্ধারণ করতে হবে—এগুলো কি বিচ্ছিন্ন কয়েকজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড ছিল, নাকি উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার ফল। এই প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্ত, স্পষ্ট জবাবদিহি এবং কার্যকর শাস্তি ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়।
গণতন্ত্রে নাগরিকের সামনে রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের পাল্টা বলপ্রয়োগের কোনো বৈধ পথ নেই। তিনি লাঠির জবাব লাঠি দিয়ে দিতে পারেন না, কিংবা বেআইনি গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে নিজেই শক্তি প্রয়োগ করতে পারেন না। তাঁর একমাত্র প্রতিরক্ষা হলো সংবিধান এবং আইনের শাসন। বহু দশক ধরে বিচার বিভাগ সেই সাংবিধানিক সুরক্ষাকবচকে অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেছে। এখন সেই সুরক্ষাকবচকে আরও কার্যকরভাবে সামনে আনার সময় এসেছে। কারণ কোনো গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি তার পুলিশের লাঠিতে নয়, বরং নাগরিকের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের আত্মসংযম এবং জবাবদিহিতার মধ্যেই নিহিত।
ইনসিয়াহ ভাহানভাটি ও আশিস ভরদ্বাজ 


















