০২:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬
ইরান যুদ্ধ: চীনের জন্য ঝুঁকি না কৌশলগত লাভ? মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুনে ইউরোপে গ্যাসের দামে অগ্নিঝড় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুনে ইউরোপে গ্যাসের দামে অগ্নিঝড় ভারত–কানাডা ইউরেনিয়াম চুক্তি: ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্যের লক্ষ্য ইরানের খামেনির মৃত্যুর পর পাকিস্তানে তোলপাড়, মার্কিন কনস্যুলেটে হামলা ও গিলগিটে কারফিউ লেবাননে হিজবুল্লাহর অস্ত্র অবৈধ ঘোষণা, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা বাড়ছে কেরালায় বাড়ি নির্মাণের মজুরি নিয়ে বিহারে রক্তাক্ত হামলা, দরভাঙ্গায় জাতিগত সংঘর্ষে উত্তাল হারিনগর কাতারএনার্জির উৎপাদন স্থগিত, ড্রোন হামলায় কাঁপছে বিশ্ব গ্যাস বাজার দুবাইয়ে ইরানের হামলা, কাঁপছে নিরাপদ আশ্রয়ের তকমা—মধ্যপ্রাচ্যের আর্থিক কেন্দ্র কি সংকটে? হাসিনা-কাদেরের বিরুদ্ধে ‘জুলাই অভ্যুত্থান হত্যা’ মামলায় অব্যাহতির সুপারিশ, তিন মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ: তেলের দামে অস্থিরতা, মার্কিন অর্থনীতির নতুন ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়তেই নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। ইরানের ইসলামপন্থী শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুরু হওয়া হামলা এখন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাই জোরালো হচ্ছে। এরই মধ্যে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছে আবার কিছুটা নেমেছে। হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত নৌপথে জাহাজ চলাচলেও ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে ইরানের 'না'

তেলের বাজারে অস্থিরতা

সংঘাতের জেরে সপ্তাহান্তেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী অঞ্চল হওয়ায় যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি জ্বালানি বাজারে পড়ছে। যদিও নিজস্ব তেল ও গ্যাস উৎপাদনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র অনেক উন্নত দেশের তুলনায় তুলনামূলক সুরক্ষিত, তবু বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কা শেষ পর্যন্ত মার্কিন অর্থনীতিতেই ফিরে আসতে পারে।

বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ‘চাঙা’ বলে উল্লেখ করেছিল। করপোরেট প্রধানদের এক জরিপেও দেখা যায়, শিল্প ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের আস্থা বেড়েছে। কিন্তু প্রায় ৬০ শতাংশ নির্বাহী সতর্ক করেছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। ইরান যুদ্ধ সেই আশঙ্কাকেই বাস্তব করে তুলছে।

পশ্চিম এশিয়া সংঘাতে চড়ছে তেলের দাম, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা

ফেডের নীতিতে অনিশ্চয়তা

এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদনীতি কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। তেলের দাম কতটা বাড়ে এবং সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয়—তার ওপরই নির্ভর করবে সিদ্ধান্ত। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময় প্রথমে নরম অবস্থান নিলেও পরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দ্রুত সুদ বাড়াতে হয়েছিল ফেডকে।

বর্তমানে বাজারে ইঙ্গিত মিলছে, এ বছর দুবার সুদ কমানোর সম্ভাবনা এখনও রয়েছে। তবে সাবেক ফেড প্রধান জ্যানেট ইয়েলেন সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে। এতে সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

জ্যানেট ইয়েলেন - উইকিপিডিয়া

 

বাজারের প্রতিক্রিয়া

দুই বছরের সরকারি বন্ডের সুদ প্রথমে কমলেও পরে আবার বাড়তে শুরু করেছে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। শ্রমবাজারের সর্বশেষ তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দুই দিকেই যেতে পারে। যদি দ্রুত সমাধান আসে এবং ইরানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন স্থিতিশীলতা আনে, তাহলে তেলের দামের ধাক্কা সাময়িক হতে পারে। কিন্তু সংঘাত যদি আঞ্চলিক পর্যায়ে বিস্তৃত হয় এবং জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যপথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে, তাহলে তেলের দাম ১২০ ডলারের ওপরে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হতে পারে, বেকারত্ব বাড়তে পারে।

আরও একটি আশঙ্কা হলো দীর্ঘস্থায়ী অসমমিত প্রতিক্রিয়া। সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও ইরান সাইবার হামলা, আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠী ও জ্বালানি স্থাপনায় আঘাতের মাধ্যমে চাপ তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যে কাতারের গ্যাস স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর পরিস্থিতির গভীরতাই ইঙ্গিত করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা

অর্থনীতির সহনশীলতা এখন পরীক্ষায়

গত এক বছরে বাণিজ্য ও অভিবাসনসংক্রান্ত ধাক্কা সামলেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ নতুন করে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। করপোরেট বিনিয়োগ, ভোক্তা আস্থা এবং আর্থিক বাজার—সবখানেই সতর্কতা বাড়ছে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যুদ্ধ কতটা দীর্ঘ হবে এবং তা কতদূর বিস্তৃত হবে। কারণ তেলের বাজার থেকে শুরু করে সুদনীতি—সবকিছুর কেন্দ্রেই এখন যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধ: চীনের জন্য ঝুঁকি না কৌশলগত লাভ?

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ: তেলের দামে অস্থিরতা, মার্কিন অর্থনীতির নতুন ঝুঁকি

১২:২৩:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়তেই নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। ইরানের ইসলামপন্থী শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুরু হওয়া হামলা এখন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাই জোরালো হচ্ছে। এরই মধ্যে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছে আবার কিছুটা নেমেছে। হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত নৌপথে জাহাজ চলাচলেও ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে ইরানের 'না'

তেলের বাজারে অস্থিরতা

সংঘাতের জেরে সপ্তাহান্তেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী অঞ্চল হওয়ায় যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি জ্বালানি বাজারে পড়ছে। যদিও নিজস্ব তেল ও গ্যাস উৎপাদনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র অনেক উন্নত দেশের তুলনায় তুলনামূলক সুরক্ষিত, তবু বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কা শেষ পর্যন্ত মার্কিন অর্থনীতিতেই ফিরে আসতে পারে।

বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ‘চাঙা’ বলে উল্লেখ করেছিল। করপোরেট প্রধানদের এক জরিপেও দেখা যায়, শিল্প ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের আস্থা বেড়েছে। কিন্তু প্রায় ৬০ শতাংশ নির্বাহী সতর্ক করেছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। ইরান যুদ্ধ সেই আশঙ্কাকেই বাস্তব করে তুলছে।

পশ্চিম এশিয়া সংঘাতে চড়ছে তেলের দাম, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা

ফেডের নীতিতে অনিশ্চয়তা

এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদনীতি কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। তেলের দাম কতটা বাড়ে এবং সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয়—তার ওপরই নির্ভর করবে সিদ্ধান্ত। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময় প্রথমে নরম অবস্থান নিলেও পরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দ্রুত সুদ বাড়াতে হয়েছিল ফেডকে।

বর্তমানে বাজারে ইঙ্গিত মিলছে, এ বছর দুবার সুদ কমানোর সম্ভাবনা এখনও রয়েছে। তবে সাবেক ফেড প্রধান জ্যানেট ইয়েলেন সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে। এতে সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

জ্যানেট ইয়েলেন - উইকিপিডিয়া

 

বাজারের প্রতিক্রিয়া

দুই বছরের সরকারি বন্ডের সুদ প্রথমে কমলেও পরে আবার বাড়তে শুরু করেছে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। শ্রমবাজারের সর্বশেষ তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দুই দিকেই যেতে পারে। যদি দ্রুত সমাধান আসে এবং ইরানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন স্থিতিশীলতা আনে, তাহলে তেলের দামের ধাক্কা সাময়িক হতে পারে। কিন্তু সংঘাত যদি আঞ্চলিক পর্যায়ে বিস্তৃত হয় এবং জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যপথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে, তাহলে তেলের দাম ১২০ ডলারের ওপরে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হতে পারে, বেকারত্ব বাড়তে পারে।

আরও একটি আশঙ্কা হলো দীর্ঘস্থায়ী অসমমিত প্রতিক্রিয়া। সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও ইরান সাইবার হামলা, আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠী ও জ্বালানি স্থাপনায় আঘাতের মাধ্যমে চাপ তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যে কাতারের গ্যাস স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর পরিস্থিতির গভীরতাই ইঙ্গিত করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা

অর্থনীতির সহনশীলতা এখন পরীক্ষায়

গত এক বছরে বাণিজ্য ও অভিবাসনসংক্রান্ত ধাক্কা সামলেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ নতুন করে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। করপোরেট বিনিয়োগ, ভোক্তা আস্থা এবং আর্থিক বাজার—সবখানেই সতর্কতা বাড়ছে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যুদ্ধ কতটা দীর্ঘ হবে এবং তা কতদূর বিস্তৃত হবে। কারণ তেলের বাজার থেকে শুরু করে সুদনীতি—সবকিছুর কেন্দ্রেই এখন যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ।