ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশ। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন তা নিয়ে জল্পনা ছিল, তবে সাম্প্রতিক হামলায় তাঁর মৃত্যুর পর সেই প্রশ্ন এখন তীব্র বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি।

উত্তরসূরি বাছাইয়ে নতুন গতি
খামেনির বয়স ৮৬ পেরোনোর পর থেকেই উত্তরসূরি প্রশ্নটি ধীরে ধীরে সামনে আসছিল। তবে আকস্মিক হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে জরুরি করে তুলেছে। ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদই নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্ধারণ করবে। সেই আলোচনায় হাসান খোমেনির নাম গুরুত্ব পাচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন।
হাসান খোমেনি ৫৩ বছর বয়সী এক মধ্যমপন্থী ধর্মীয় আলেম হিসেবে পরিচিত। তিনি তেহরানের দক্ষিণে তাঁর দাদার মাজারের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতীকী গুরুত্বের এই পদ তাঁকে জনজীবনে দৃশ্যমান রেখেছে, যদিও তিনি কখনও সরাসরি সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করেননি।

সংস্কারপন্থী অবস্থান ও বিতর্ক
ইরানের রাজনীতিতে হাসান খোমেনিকে তুলনামূলক উদারপন্থী হিসেবে দেখা হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি ও হাসান রুহানির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পশ্চিমাদের সঙ্গে সংলাপ ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পক্ষে থাকা এই নেতাদের প্রতি তাঁর সমর্থন প্রকাশ্য।
২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে প্রার্থী বাছাইয়ে সংস্কারপন্থীদের অযোগ্য ঘোষণা করায় তিনি অভিভাবক পরিষদের সমালোচনা করেছিলেন। ওই সিদ্ধান্তের ফলেই কট্টরপন্থী ইব্রাহিম রাইসির জয় সহজ হয়। হাসান খোমেনি তখন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জনগণের ভোটাধিকার খর্ব করা উচিত নয়।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, সেখানেও তিনি স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি তুলেছিলেন। একইসঙ্গে তিনি রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান ও সহিংসতার বিরোধিতাও করেন। এতে স্পষ্ট হয়, তিনি ব্যবস্থার প্রতি অনুগত থাকলেও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন।

কট্টরপন্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ?
খামেনির আমলে কট্টরপন্থীদের প্রভাব বেড়েছে। বিশেষ করে তাঁর ছেলে মুজতবা খামেনির নাম সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ঘুরছে। এই প্রেক্ষাপটে হাসান খোমেনিকে কেউ কেউ বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক অস্থিরতার পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে তুলনামূলক মধ্যপন্থী নেতৃত্ব প্রয়োজন—এমন মতও রাজনৈতিক অঙ্গনে শোনা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলেও এক দশক আগে তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। তাঁর ধর্মীয় মর্যাদা আয়াতুল্লাহ নয়, হুজ্জতুল ইসলাম হওয়ায় সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানানো হয়েছিল। তবে অনেকের মতে, এটি ছিল সংস্কারপন্থী শিবিরকে ঠেকানোর কৌশল।

ইসরায়েল ও পশ্চিমবিরোধী অবস্থান
যদিও তাঁকে মধ্যপন্থী বলা হয়, ইসরায়েল সম্পর্কে তাঁর অবস্থান কঠোর। তিনি ইসরায়েলকে পশ্চিমা সমর্থিত শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং মুসলিম বিশ্বকে শক্তিশালী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের সময়ও তিনি খামেনির নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
একইসঙ্গে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নিয়েও তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিকে তিনি সমর্থন করেছিলেন, যা পরে যুক্তরাষ্ট্র বাতিল করে দেয়।

ব্যক্তিজীবন ও ভাবধারা
হাসান খোমেনিকে তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা প্রগতিশীল ধর্মতাত্ত্বিক হিসেবে বর্ণনা করেন। সংগীত, নারীর অধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি তুলনামূলক খোলামেলা দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। আরবি ও ইংরেজিতে সাবলীল এই আলেম তরুণ বয়সে ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন, পরে কোম শহরে গিয়ে ধর্মতত্ত্বে উচ্চশিক্ষা নেন।
এখন প্রশ্ন একটাই—ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্য কি মধ্যপন্থার দিকে ঝুঁকবে, নাকি কট্টর অবস্থানই বজায় থাকবে? সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু যে দেশটির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে, তা স্পষ্ট। আর সেই অধ্যায়ের অন্যতম প্রধান চরিত্র হয়ে উঠেছেন হাসান খোমেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















