মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এতদিন একটি শহরকে আলাদা করে দেখা হতো। ঝকঝকে অট্টালিকা, করমুক্ত আয়, সহজ ব্যবসা পরিবেশ আর নীরব এক আশ্বাস—চারপাশে যাই ঘটুক, দুবাই নিরাপদ। সেই দীর্ঘদিনের ধারণাই এখন বড় পরীক্ষার মুখে।
শনিবার উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের পাল্টা হামলা সরাসরি আঘাত হানে দুবাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয়। বিমানবন্দর, বন্দর ও বিলাসবহুল হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শারীরিক ক্ষতির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানসিক ধাক্কা। যে শহর নিজেকে চার দশক ধরে অস্থির অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিল, তার ভিত্তিই যেন নড়ে ওঠে।

আস্থার ভিত নড়বড়ে
সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আশ্বাস দেয়। জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানায়, অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবুও বাসিন্দা ও বিনিয়োগকারীদের চোখে উদ্বেগ স্পষ্ট। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পরিচিত স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দৃশ্য বহু মানুষের কাছে এক নতুন বাস্তবতার বার্তা দেয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুবাইয়ের অর্থনৈতিক মডেলের মূল ভিত্তিই ছিল নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প গন্তব্যের খোঁজ শুরু হতে পারে। আন্তর্জাতিক পুঁজি অত্যন্ত চলনশীল—অস্থিরতার ইঙ্গিত পেলেই তা সরে যেতে পারে।
নজিরবিহীন বাজার বন্ধ
হামলার পর আবুধাবি ও দুবাইয়ের শেয়ারবাজার দুই দিন বন্ধ রাখা হয়, যা দেশটির ইতিহাসে নজিরবিহীন। প্রযুক্তিগত বিঘ্নের কারণে কিছু ব্যাংকিং সেবাও ব্যাহত হয়। আকাশপথ আংশিক বন্ধ থাকায় হাজারো যাত্রী আটকে পড়েন।
একই সঙ্গে সোনার বার কেনার চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। কিছু বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য ছাঁটাই ও তহবিল সংগ্রহ স্থগিতের পরিকল্পনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক বেসরকারি ব্যাংকগুলোও তাদের কার্যক্রমের পরিসর পুনর্বিবেচনা করছে।

কীভাবে গড়ে উঠেছিল ব্র্যান্ড দুবাই
মুক্তা আহরণ ও মাছ ধরার ছোট বন্দর থেকে বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রে রূপান্তর ছিল দীর্ঘ প্রক্রিয়া। উনিশশো পঁচাশি সালে জাতীয় উড়োজাহাজ সংস্থা চালু, নিরানব্বই সালে প্রতীকী বিলাসবহুল হোটেলের উদ্বোধন এবং দুই হাজার দশকের শুরুতে বিদেশিদের সম্পত্তি মালিকানার অনুমতি—এসব পদক্ষেপই ব্র্যান্ড দুবাইয়ের ভিত গড়ে দেয়।
বর্তমানে দুবাইয়ের অর্থনীতিতে তেলের অবদান দুই শতাংশেরও কম। বাণিজ্য, পর্যটন, উচ্চমূল্যের আবাসন ও আর্থিক সেবাই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। উপসাগরের অন্যান্য দেশের তুলনায় এই বৈচিত্র্যই দুবাইকে আলাদা পরিচয় দেয়।
আরব বসন্ত, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ কিংবা ইউক্রেন সংঘাতের পর বহু ধনী পরিবার ও উদ্যোক্তা দুবাইয়ে আশ্রয় নেন। গত কয়েক দশকে দেশটির জনসংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। ধনীদের আগমনে আবাসন খাতে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে, যা উন্নয়ন সংস্থাগুলোর শেয়ারমূল্য রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

ভৌগোলিক ঝুঁকি সামনে এল
তবে দুর্বলতা আগেও ছিল। হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থান দুবাইকে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে রাখে। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়। ইরান উপসাগরের ঠিক অপর প্রান্তে অবস্থান করায় সম্ভাব্য সংঘাতের প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক হামলায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জেবেল আলি বন্দরের একটি অংশে আগুন লাগে এবং বিলাসবহুল হোটেলেও ক্ষতি হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী কয়েকজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়েছেন।

সামনে কোন পথ
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, শক্ত নীতি ও প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে দেশটি অতীতেও সংকট সামলেছে। তবে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি অন্যত্র সরতে পারে। এর প্রভাব শুধু দুবাই নয়, গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য পরিকল্পনায় পড়বে।
এ মুহূর্তে বড় প্রশ্ন একটাই—এই সংঘাত কতদিন চলবে। কারণ সময় যত বাড়বে, দুবাইয়ের নিরাপদ আশ্রয়ের ভাবমূর্তির ওপর চাপও তত বাড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















