ড্রোন হামলার জেরে বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি তাদের উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্তে বিশ্ব গ্যাস বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, দাম বেড়েছে হু হু করে, আর এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ড্রোন হামলার পর কেন বন্ধ হলো উৎপাদন
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ড্রোন হামলায় মেসাইয়েদ শিল্পনগরীর একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির ট্যাংক এবং রাস লাফান শিল্প কমপ্লেক্সে কাতারএনার্জির একটি জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে।
রাস লাফান কমপ্লেক্স থেকেই মূলত রপ্তানির জন্য গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করা হয়। পরিস্থিতিকে ‘ফোর্স মাজর’ হিসেবে ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠানটি চুক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকে সাময়িক অব্যাহতি নিয়েছে।

হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা, জাহাজ চলাচলে বড় ধাক্কা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা এবং সমুদ্রপথে সংঘর্ষের কারণে হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে অন্তত দেড়শ’ জাহাজ নোঙর করে আছে, যার মধ্যে গ্যাসবাহী জাহাজও রয়েছে।
প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন প্রায় ছিয়াশি শতাংশ কমে গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য। দুই পাশে প্রায় সাতশ’ জাহাজ অপেক্ষায় থাকায় বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ বেড়েছে।
বিশ্ব বাজারে প্রভাব কতটা গভীর
বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় বিশ শতাংশই আসে কাতার থেকে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে এবং দাম বেড়েছে দ্রুত। নেদারল্যান্ডস ও ব্রিটেনের পাইকারি গ্যাসের মূল্য প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এশীয় বাজারেও দাম প্রায় চল্লিশ শতাংশ লাফ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে অস্থিরতা বাড়লেও এটি এখনই পূর্ণাঙ্গ সংকট নয়। তবে কাতার বা উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হতে পারে।

এশিয়া ও ইউরোপে বাড়ছে উদ্বেগ
কাতারএনার্জির মোট বিক্রয়ের প্রায় বিরাশি শতাংশ যায় এশিয়ার দেশে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশ সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।
চীন বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস আমদানিকারক হলেও তাদের বড় অংশ আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে। তবুও বৈশ্বিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব এশিয়া জুড়ে পড়বে।
ইউরোপেও চাপ বাড়ছে। যদিও শীতের তীব্র সময় পেরিয়ে গেছে, তবুও সরবরাহ কমে গেলে মজুত ও দামের ওপর প্রভাব পড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যাস সমন্বয় দল পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বৈঠকে বসছে।

বিশ্বে শীর্ষ রপ্তানিকারক কারা
দুই হাজার বাইশ সালের আগে রাশিয়া ছিল শীর্ষ রপ্তানিকারক। ইউক্রেন যুদ্ধের পর সেই অবস্থান বদলে যায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম, তার পরেই কাতার এবং অস্ট্রেলিয়া। ফলে কাতারের উৎপাদন স্থগিতের প্রভাব বৈশ্বিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি বাজার এখন তীব্র অস্থিরতার মুখে। পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতি ও গ্যাসনির্ভর দেশগুলোর ভবিষ্যৎ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















