কেরালায় নির্মিত একটি বাড়ির বকেয়া মজুরি ঘিরে প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে বিহারের দরভাঙ্গায় ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র জাতিগত সংঘর্ষ। হারিনগর গ্রামের পাশওয়ান টোলায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দায়ের হয়েছে দুই পক্ষের পৃথক মামলা। তফসিলি জাতি ও উপজাতি নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে অভিযোগ নেওয়ার পর পরিস্থিতি ঘিরে উত্তেজনা এখনও কাটেনি।
হারিনগরে সকালবেলার হামলা
গত ৩১ জানুয়ারি সকালে তিন শতাধিক ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ভুক্ত লোকজন পাশওয়ান টোলায় ঢুকে কৈলাশ পাশওয়ানের বাড়িতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ। গ্রামটির একটি কাঁচা রাস্তা উপরের জাতের বসতি ও পাশওয়ান টোলাকে আলাদা করে রেখেছে। হামলায় একাধিক ঘরবাড়ি, গরুর খোঁয়াড় ও একটি খাবারের দোকান ভেঙে ফেলা হয়। গুরুতর আহত ১১ জনকে দরভাঙ্গা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন কৈলাশের ছোট ভাই।
পুলিশ কুশেশ্বর আস্থান থানায় ৭০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ১৫০ অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা নেয়। অভিযুক্তদের মধ্যে হেমকান্ত ঝা ও আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে আগের দিন হেমকান্ত ঝাকে মারধর, ছিনতাই ও অর্থ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগে পাশওয়ান পরিবারের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।
মজুরি বকেয়া থেকেই সূত্রপাত
কৈলাশ পাশওয়ান দাবি করেন, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কেরালার কোঝিকোডে হেমকান্ত ঝার বোন মীনা দেবীর বাড়ি নির্মাণে তিনি ও তাঁর ভাইরা কাজ করেন। মোট তিন লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার টাকার মধ্যে এক লক্ষ তেরো হাজার টাকা দেওয়া হয়, বাকি অর্থ পরে দেওয়ার আশ্বাস থাকলেও প্রায় দশ বছরেও তা পরিশোধ করা হয়নি। সম্প্রতি গ্রামে দেখা হলে তিনি বকেয়া টাকা চান, এর পরদিনই হামলা হয় বলে তাঁর অভিযোগ।
অন্যদিকে ব্রাহ্মণ পাড়ার বাসিন্দাদের বক্তব্য, পাশওয়ানরাই প্রথমে হেমকান্ত ঝাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধর করেন এবং সোনার চেইন ও নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেন। তাঁদের দাবি, সমস্ত পাওনা আগেই মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং মিথ্যা অভিযোগে আইনের অপব্যবহার করা হচ্ছে।
পঞ্চায়েতের ব্যর্থ মধ্যস্থতা
গ্রামের প্রধান জানান, বিষয়টি মীমাংসার জন্য গত ডিসেম্বর এবং ঘটনার দশ দিন আগে বৈঠক হলেও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তাঁর মতে, হামলার পথ না বেছে পঞ্চায়েতেই সমাধান সম্ভব ছিল। বর্তমানে গ্রামে পুলিশ টহল জোরদার রয়েছে এবং বহু ব্রাহ্মণ পুরুষ সদস্য গ্রাম ছেড়েছেন বলে জানা গেছে।
বিহারে জাতি ও অভিবাসনের বাস্তবতা
বিহার থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ জীবিকার তাগিদে বাইরে কাজ করেন। কেরালায় উচ্চ মজুরি ও শ্রমবান্ধব পরিবেশের কারণে সেখানে বিহারের বহু শ্রমিক গিয়েছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী কেরালায় নিবন্ধিত অভিবাসী শ্রমিকের মধ্যে বিহারের শ্রমিক উল্লেখযোগ্য অংশ। নির্মাণ খাতেই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদিকে তফসিলি জাতি ও উপজাতি নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের অপব্যবহার না করার সতর্কবার্তা এসেছে, অন্যদিকে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। আহতদের সঙ্গে দেখা করে সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক মহল থেকে।
এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন কৈলাশ। বকেয়া মজুরি আদৌ পাবেন কি না, সে প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে অজানা। তবে এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, অভিবাসী শ্রম, বকেয়া মজুরি ও জাতিগত টানাপোড়েন মিলেই বিস্ফোরক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে হারিনগরে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















