মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। লেবাননের মন্ত্রিসভা নজিরবিহীন এক সিদ্ধান্তে হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং অবিলম্বে তাদের অস্ত্র রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছে। একই সময়ে ইরানকে ঘিরে চলমান অভিযানের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে গোটা অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
হিজবুল্লাহর অস্ত্র অবৈধ, রাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা
সোমবার বৈরুতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে লেবাননের মন্ত্রিসভা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের বাইরে থেকে পরিচালিত কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা অভিযান গ্রহণযোগ্য নয়। যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্ত কেবল সরকারের হাতে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম সিদ্ধান্তগুলো প্রকাশ করে বলেন, সরকার হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতে যেতে চায় না, কিন্তু লেবাননের মাটি থেকে রকেট নিক্ষেপ কিংবা গৃহযুদ্ধের হুমকি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
মন্ত্রিসভা লিতানি নদীর উত্তরে সব অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়। এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই লেবাননের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ইব্রাহিম ম্নেইমনে বলেন, এই সংবেদনশীল সময়ে সরকারের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব সুসংহত করবে। বেকা অঞ্চলের সংসদ সদস্য বিলাল আল হৌশাইমি সতর্ক করে বলেন, লেবানন আর নতুন কোনো অভিযানের ঝুঁকি নিতে পারবে না। এটি হয় পূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে, নয়তো আরও গভীর সংকটে পড়বে।
লেবানিজ ফোর্সেস নেতা সামির গেগেয়া বলেন, এখন সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সামনে সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সুযোগ এসেছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রী রাকান নাসেরেদ্দিন হিজবুল্লাহর পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, প্রতিরোধের জবাবদিহি নিয়ে একপাক্ষিক প্রশ্ন তোলা উচিত নয়।

রকেট হামলা, ইসরায়েলি পাল্টা আঘাত ও হতাহতের মিছিল
উত্তর ইসরায়েলের দিকে লেবানন থেকে রকেট ও ড্রোন নিক্ষেপের পর ইসরায়েল বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর, দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকায় ব্যাপক হামলা চালায়। এতে চল্লিশের বেশি মানুষ নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন। নিহতদের মধ্যে হিজবুল্লাহর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা দাবি করে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ তারা প্রকাশ করেনি।

বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনীর তৎপরতা
লেবাননের সামরিক আদালত হাইফা অভিমুখে রকেট নিক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, লিতানি নদীর উত্তরের বনাঞ্চল থেকে রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
বাস্তুচ্যুতি ও স্থল অভিযান শঙ্কা
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সতর্কবার্তার পর বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল, দক্ষিণ লেবাননের বহু গ্রাম ও বেকা অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ রাতভর গাড়িতে কিংবা সড়কের পাশে অবস্থান নেন। হোটেলগুলো পূর্ণ হয়ে গেলে অনেকে ভাড়া বাসায় আশ্রয় নেন। সরকারি স্কুল খোলা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়।
সামরিক সূত্রগুলো বলছে, এই ব্যাপক খালি করে দেওয়া হতে পারে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের পূর্বাভাস। ইসরায়েল সীমান্তে প্রায় এক লাখ রিজার্ভ সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের সামরিক প্রধান দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা বাড়ছে
এদিকে ইরান সংশ্লিষ্ট অভিযানের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লেবানন ও ইসরায়েলের চলমান উত্তেজনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ গোটা অঞ্চলে বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















