মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছাতেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নেমেছে অস্থিরতার ঝড়। বিশেষ করে ইউরোপের মানদণ্ডভিত্তিক প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম একদিনেই প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের পর এটি সবচেয়ে বড় ধাক্কা হতে পারে।
হরমুজ প্রণালীতে সরবরাহ ঝুঁকি
ইরান ও ওমানের মাঝের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সপ্তাহান্তে বহু তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ এই পথে চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বাজারে আতঙ্ক ছড়ায় এবং ইউরোপীয় গ্যাস ফিউচার এক লাফে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়।

কাতারের রস লাফান কমপ্লেক্সে ড্রোন হামলা
উত্তেজনা আরও বাড়ায় কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জির রস লাফান তরলীকৃত গ্যাস কমপ্লেক্সে ড্রোন হামলা। হামলার পর উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনায় বাজারে সরবরাহ ঘাটতির শঙ্কা আরও তীব্র হয়।
সৌদি আরবেও সতর্কতা
সৌদি আরবের রস তানুরা শোধনাগারেও হামলার আশঙ্কায় কার্যক্রম আংশিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে বলে খবর। উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত কিংবা সতর্কতামূলক বন্ধের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খল অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বিকল্প পাইপলাইন সীমিত হওয়ায় এবং জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্নের আশঙ্কা ধরে মূল্য নির্ধারণ করছেন।

ইউরোপের বাড়তি ঝুঁকি
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি কমিয়ে দেওয়ার ফলে ইউরোপ আগেই চাপে ছিল। সস্তা পাইপলাইনের গ্যাস ছেড়ে এখন তারা বেশি নির্ভরশীল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা চালানের ওপর। শীত মৌসুম শেষ হলেও গ্যাস সংরক্ষণাগারগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় কম ভর্তি। ফলে আগামী শীতের আগে মজুত পুনর্গঠনে গ্রীষ্মকালেই বড় আকারে আমদানি প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও বড় মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও বীমা ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর যুদ্ধঝুঁকি বীমা বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বেশ কিছু সামুদ্রিক বীমা সংস্থা। এতে পরিবহন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
![]()
অঞ্চলজুড়ে সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলা চালায়। তেহরান পাল্টা ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি স্থাপনায় আঘাত হানে। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলায় যুক্ত হয়েছে, যার জবাবে পাল্টা বিমান হামলা হয়েছে। ফলে গোটা অঞ্চল জুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মূল্য আরও বাড়তে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এক মাস হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকে, তাহলে ইউরোপে গ্যাসের দাম বর্তমানের তুলনায় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে গৃহস্থালি ও শিল্প খাত নতুন করে চাপে পড়বে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ বলেছেন, ইউরোপ রুশ গ্যাস থেকে সরে আসার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে। তার দাবি, গ্যাসের দাম খুব শিগগিরই দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
Sarakhon Report 



















