১১:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
চীনের সামনে এখন সাম্রাজ্যের সেই পুরোনো ফাঁদ দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নতুন প্রতিযোগিতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী কে? বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শিথিলতা: বাণিজ্য অর্থায়নে বাড়ল ঋণসীমা কেরালার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন ভি ডি সতীশন, ১৮ মে শপথের সম্ভাবনা পাকিস্তানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ‘ফাতাহ-৪’ সফল পরীক্ষা, পাল্লা ও নিখুঁত আঘাতের সক্ষমতার দাবি বেইজিং বৈঠকে ইরান ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধে ব্রিকসের জোরালো অবস্থান চাইল তেহরান মিয়ানমার নিয়ে বর্ণনার লড়াই: রাষ্ট্র, বৈধতা ও সংবাদমাধ্যমের দায় এল নিনোর শঙ্কায় ফের গম কেনায় ঝুঁকছে এশিয়া, বাড়ছে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা চীনের সস্তা চিপের চাপে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর স্বপ্ন, টাটার নতুন ফ্যাবের সামনে কঠিন লড়াই

ইরান যুদ্ধ: চীনের জন্য ঝুঁকি না কৌশলগত লাভ?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনা নয়, বিশ্বশক্তির কূটনৈতিক সমীকরণও নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে চীনের জন্য এই সংঘাত একসঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, কৌশলগত প্রভাব ও বৈশ্বিক অবস্থানের বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা নতুন করে গতি পাওয়ার কথা। অনেক বিশ্লেষকের মতে, শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রভাব দেখাতে চাইছে, যাতে চীনের কৌশলগত পরিসর সংকুচিত হয়। তবে এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে।

China's response to Iran conflict more concerning if West loses, vs  retribution for defeating its Tehran ally | Fox Business

জ্বালানি নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন

চীনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। চীনের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় অর্ধেকই বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে আসে। ফলে এই প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে চীনের শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ বাজারদরে।

ইরান এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের তেলের বড় অংশের ক্রেতা চীন। সরকারি পরিসংখ্যানে পুরো চিত্র না এলেও বাস্তবে বেইজিংয়ের জ্বালানি মিশ্রণে ইরান একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

পঁচিশ বছরের কৌশলগত সম্পর্ক

২০২১ সালে চীন ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জ্বালানি, অবকাঠামো, যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে এই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। ভৌগোলিকভাবে ইরান মধ্য এশিয়া, পারস্য উপসাগর ও ভূমধ্যসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় চীনের পশ্চিমমুখী বাণিজ্যপথে দেশটির গুরুত্ব অনেক।

রেলপথ উন্নয়ন, বন্দর বিনিয়োগ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি—সব মিলিয়ে ইরানকে আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত করতে চায় বেইজিং। পাশাপাশি বহুপাক্ষিক জোটে তেহরানের অন্তর্ভুক্তি চীনের জন্য কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেও দেখা হয়।

Op-ed: What China is thinking about U.S. strikes against Iran

তবে সমর্থনের সীমারেখা

চীন প্রকাশ্যে সামরিক হামলার নিন্দা করলেও সরাসরি সামরিক সহায়তা দেয়নি। এতে ইরানের কাছে চীনের কৌশলগত নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেইজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট—তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না।

চীন পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরানও চায় না। কারণ এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে, যা আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়াবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ততা, চীনের সুযোগ

যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ও আর্থিকভাবে আরও বেশি সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে ব্যয় করতে হবে। এতে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে ঘিরে কৌশলগত চাপ কিছুটা কমতে পারে। বেইজিং সরাসরি যুদ্ধ চায় না, তবে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অতিরিক্ত ব্যস্ততা তাদের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে এই হিসাবও ঝুঁকিমুক্ত নয়। হরমুজ প্রণালীতে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হলে চীনের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে। ফলে বেইজিং একদিকে কূটনৈতিকভাবে শান্তির আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে নিজের স্বার্থ সুরক্ষায় সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করছে।

How Iran Sees the China-US Trade War – The Diplomat

বিশ্বশক্তি হিসেবে কঠিন পরীক্ষা

ইরানকে ঘিরে চলমান সংকট চীনের জন্য এক ধরনের বাস্তব পরীক্ষা। তারা কি কেবল অর্থনৈতিক শক্তি, নাকি জটিল আন্তর্জাতিক সংকটে কার্যকর কূটনৈতিক ভূমিকা রাখতে সক্ষম—এই প্রশ্নের উত্তরও নির্ভর করছে বর্তমান পরিস্থিতির ওপর।

সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তার অভিঘাত শুধু তেহরান বা ওয়াশিংটনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা পৌঁছে যাবে বেইজিংয়ের উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে। তাই ইরান যুদ্ধ চীনের জন্য দূরের কোনো ঘটনা নয়, বরং তাদের বৈশ্বিক উত্থানের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের সামনে এখন সাম্রাজ্যের সেই পুরোনো ফাঁদ

ইরান যুদ্ধ: চীনের জন্য ঝুঁকি না কৌশলগত লাভ?

০২:১৫:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনা নয়, বিশ্বশক্তির কূটনৈতিক সমীকরণও নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে চীনের জন্য এই সংঘাত একসঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, কৌশলগত প্রভাব ও বৈশ্বিক অবস্থানের বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা নতুন করে গতি পাওয়ার কথা। অনেক বিশ্লেষকের মতে, শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রভাব দেখাতে চাইছে, যাতে চীনের কৌশলগত পরিসর সংকুচিত হয়। তবে এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে।

China's response to Iran conflict more concerning if West loses, vs  retribution for defeating its Tehran ally | Fox Business

জ্বালানি নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন

চীনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। চীনের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় অর্ধেকই বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে আসে। ফলে এই প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে চীনের শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ বাজারদরে।

ইরান এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের তেলের বড় অংশের ক্রেতা চীন। সরকারি পরিসংখ্যানে পুরো চিত্র না এলেও বাস্তবে বেইজিংয়ের জ্বালানি মিশ্রণে ইরান একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

পঁচিশ বছরের কৌশলগত সম্পর্ক

২০২১ সালে চীন ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জ্বালানি, অবকাঠামো, যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে এই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। ভৌগোলিকভাবে ইরান মধ্য এশিয়া, পারস্য উপসাগর ও ভূমধ্যসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় চীনের পশ্চিমমুখী বাণিজ্যপথে দেশটির গুরুত্ব অনেক।

রেলপথ উন্নয়ন, বন্দর বিনিয়োগ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি—সব মিলিয়ে ইরানকে আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত করতে চায় বেইজিং। পাশাপাশি বহুপাক্ষিক জোটে তেহরানের অন্তর্ভুক্তি চীনের জন্য কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেও দেখা হয়।

Op-ed: What China is thinking about U.S. strikes against Iran

তবে সমর্থনের সীমারেখা

চীন প্রকাশ্যে সামরিক হামলার নিন্দা করলেও সরাসরি সামরিক সহায়তা দেয়নি। এতে ইরানের কাছে চীনের কৌশলগত নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেইজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট—তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না।

চীন পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরানও চায় না। কারণ এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে, যা আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়াবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ততা, চীনের সুযোগ

যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ও আর্থিকভাবে আরও বেশি সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে ব্যয় করতে হবে। এতে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে ঘিরে কৌশলগত চাপ কিছুটা কমতে পারে। বেইজিং সরাসরি যুদ্ধ চায় না, তবে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অতিরিক্ত ব্যস্ততা তাদের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে এই হিসাবও ঝুঁকিমুক্ত নয়। হরমুজ প্রণালীতে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হলে চীনের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে। ফলে বেইজিং একদিকে কূটনৈতিকভাবে শান্তির আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে নিজের স্বার্থ সুরক্ষায় সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করছে।

How Iran Sees the China-US Trade War – The Diplomat

বিশ্বশক্তি হিসেবে কঠিন পরীক্ষা

ইরানকে ঘিরে চলমান সংকট চীনের জন্য এক ধরনের বাস্তব পরীক্ষা। তারা কি কেবল অর্থনৈতিক শক্তি, নাকি জটিল আন্তর্জাতিক সংকটে কার্যকর কূটনৈতিক ভূমিকা রাখতে সক্ষম—এই প্রশ্নের উত্তরও নির্ভর করছে বর্তমান পরিস্থিতির ওপর।

সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তার অভিঘাত শুধু তেহরান বা ওয়াশিংটনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা পৌঁছে যাবে বেইজিংয়ের উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে। তাই ইরান যুদ্ধ চীনের জন্য দূরের কোনো ঘটনা নয়, বরং তাদের বৈশ্বিক উত্থানের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।