মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান ছয়টি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে অন্তত চার মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে ওয়াশিংটন। পাশাপাশি শত শত কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের ওপর হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের অনুতপ্ত হতে হবে। এই বক্তব্যের মধ্যেই শুরু হয় পাল্টা আঘাত।

মধ্যপ্রাচ্যে কত ঘাঁটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯টি স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি সবচেয়ে বড়, যেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েন আছে এবং এটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী সদর দপ্তর হিসেবে কাজ করে। বাহরাইন, মিশর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্থায়ী স্থাপনা রয়েছে। অঞ্চলজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
ইরান ইতোমধ্যে এই সব ঘাঁটিকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু ঘোষণা করেছে। পারস্য উপসাগরে দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বাহরাইন থেকে কাতার: কোথায় কী ক্ষতি
বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও শাহেদ ড্রোন হামলার খবর মিলেছে। উপগ্রহ চিত্রে রাডার ও সংরক্ষণাগারের ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মানামা শহর ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকাতেও বিস্ফোরণের খবর রয়েছে।
ইরাকের এরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি টানা দুই দিন গোলাবর্ষণের মুখে পড়ে। মার্কিন কনস্যুলেট সংলগ্ন এলাকায়ও ড্রোন আঘাতের তথ্য সামনে এসেছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়।
জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটির আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওতে লক্ষ্যভেদ হয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলছে।

কুয়েতে আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি, ক্যাম্প আরিফজান ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। ক্যাম্প আরিফজানে হামলায় চার মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে কয়েকজন আহত হয়েছে। কুয়েতের আকাশে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যা ‘বন্ধুসুলভ আগুন’ বলে ব্যাখ্যা দিয়েছে পেন্টাগন।
কাতারের রাজধানী দোহায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আল উদেইদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। একটি আগাম সতর্কতা রাডার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কাতার নিশ্চিত করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। আবুধাবির আল-ধাফরা ঘাঁটি এবং দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। সৌদি আরবে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও অধিকাংশ প্রতিহত করা হয়েছে বলে দাবি রিয়াদের।

কতজন নিহত, কতটা ক্ষতি
সরকারিভাবে চার মার্কিন সেনা নিহতের তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। তবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, তাদের হামলায় অন্তত ২০০ মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হয়েছে। এই সংখ্যার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ইঙ্গিত দিয়েছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে।
বিমানবাহী রণতরী কি আঘাত পেয়েছে
ইরানি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলেও লক্ষ্যভেদ হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে এই সামরিক সংঘাত এখন সরাসরি ইরান-মার্কিন মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নিয়েছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, তেল সরবরাহ ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা—সবকিছুই নতুন অনিশ্চয়তার মুখে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















