হিমালয় ঘেরা নেপাল আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের সামনে। গত বছরের তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রজন্ম জাগরণ আন্দোলনের জেরে জোট সরকার পতন, সংসদ ভেঙে অন্তর্বর্তী প্রশাসন—এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রতিনিধি সভার নির্বাচন। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই বছর আগেই হওয়া এই ভোট এখন পুরনো রাজনৈতিক শক্তি ও নতুন বিকল্পের সরাসরি লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
কারা লড়ছে, কারা নজরে
এই নির্বাচনে ডজনখানেক দল অংশ নিলেও মূল লড়াই চার শক্তির মধ্যে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নেপালি কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল) ও নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির বিপরীতে দাঁড়িয়েছে তিন বছর আগে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টি। দলটি নিজেকে প্রতিষ্ঠাবিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।
কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী মুখ হিসেবে সামনে এনে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টি নগর ও তরুণ সমাজে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে। বিশাল সমাবেশ ও সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও তা কতটা ভোটে রূপ নেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

নেপালের নির্বাচনী পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে
২০১৫ সালের সংবিধান অনুযায়ী নেপালের প্রতিনিধি সভায় ২৭৫টি আসন। এর মধ্যে ১৬৫টি আসনে সরাসরি ভোটে প্রার্থী নির্বাচিত হন এবং ১১০টি আসন বণ্টন হয় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে দলীয় তালিকার ভিত্তিতে। এবারের নির্বাচনে তিন হাজার চারশোর বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রায় এক কোটি নব্বই লাখ ভোটারের মধ্যে আট লাখের মতো প্রথমবারের ভোটার। আনুপাতিক আসনে নারী ও ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সমালোচকদের অভিযোগ, বাস্তবে দলীয় অনুগতদেরই বেশি সুযোগ দেওয়া হয়।
ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ
দুর্বল শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও তরুণদের বিদেশমুখী হওয়া—এই চার ইস্যুই ভোটের কেন্দ্রবিন্দুতে। নেপালের অর্থনীতি এখনো প্রবাসী আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কাজের খোঁজে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন।
বড় দলগুলো ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নেপালি কংগ্রেস পাঁচ বছরে পনেরো লাখ কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলেছে। ইউএমএল বছরে পাঁচ লাখ চাকরির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টি ১৯৯০ সাল থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখার প্রস্তাব দিয়েছে।

তরুণ ভোট কতটা নির্ণায়ক
প্রথমবারের আট লাখ ভোটার অনেক আসনে ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। গত বছরের রাজপথের আন্দোলন কি ভোটকেন্দ্রে পরিবর্তন আনতে পারবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন। বিশ্লেষকদের মতে, ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর প্রতি হতাশা নতুন বিকল্পের জন্য জায়গা তৈরি করেছে। তবে আন্দোলনের শক্তি সবসময় নির্বাচনী সাফল্যে রূপ নেয় না।

চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সমীকরণে নতুন চাপ
এই নির্বাচন ঘিরে আঞ্চলিক কূটনৈতিক নজরও তীব্র। ভারত নেপালের প্রধান বাণিজ্য ও জ্বালানি অংশীদার। চীন অবকাঠামো সহযোগিতায় সক্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রও উন্নয়ন সহায়তা ও অবকাঠামো প্রকল্পে উপস্থিতি বাড়িয়েছে।
নেপালের বামঘেঁষা দলগুলোকে সাধারণত বেইজিংঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়, আর নেপালি কংগ্রেস ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টিকে দিল্লিবান্ধব বলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে কাঠমান্ডুর সরকারগুলো এতদিন তিন শক্তির মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার নীতি অনুসরণ করেছে।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, নতুন সরকারকে একই সঙ্গে ভারতের উদ্বেগ, চীনের সন্দেহ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা সামলাতে হবে। ফলে নেপালের ঐতিহ্যগত ভারসাম্য নীতি আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই নির্বাচন তাই শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়, বরং নেপালের গণতন্ত্র, তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা এবং বৈদেশিক নীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণের মোড়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















