ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সামরিক পদক্ষেপ বেইজিংকে কৌশলগত চাপে ফেলেছে এবং সম্ভাব্য বৈঠকে ট্রাম্পের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ
মার্চের শেষ দিকে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কথা রয়েছে। তার আগে জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। ভেনেজুয়েলা ও ইরান—দুই দেশই চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী ছিল।
এই ধারাবাহিক সামরিক পদক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছে, ট্রাম্প প্রয়োজনে চীনের ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের বিরুদ্ধেও শক্তি প্রয়োগে দ্বিধা করেন না।

বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় হবে বাণিজ্য। তবে বৈঠক আদৌ হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ঘোষণা করেনি।
কিছুদিন আগেও মনে হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে ট্রাম্পের বেশ কয়েকটি শুল্ক বাতিল হওয়ায় তিনি দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন। কিন্তু ইরানে সামরিক অভিযানের পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন শি জিনপিংকেই অস্বস্তিকর অবস্থানে পড়তে হচ্ছে।
তিনি যদি বৈঠকে অংশ নেন, তাহলে বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে হবে। আর বৈঠক বাতিল করলে সেটিও কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর বার্তা দেবে।
চীনের সীমিত প্রতিক্রিয়া
ইরান ইস্যুতে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে নিন্দা জানালেও তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল পরিমিত। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে চীনের প্রভাব সীমিত। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে, বেইজিংয়ের কূটনৈতিক অংশীদারিত্ব অনেকাংশে বাস্তববাদী ও লেনদেনভিত্তিক।
চীনের জন্য এই পরিস্থিতি প্রতীকী ও বাস্তব—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র আবারও প্রমাণ করল, তারা কেবল নিজেদের অঞ্চলেই নয়, বিশ্বজুড়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগে সক্ষম।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইরানি তেল আমদানিকারক। গত বছর সমুদ্রপথে আমদানিকৃত মোট তেলের প্রায় ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে ইরান থেকে। ফলে সংঘাত বাড়লে বা হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে চীন সরাসরি সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়বে।
স্বল্পমেয়াদে ইরানি তেলের ঘাটতি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তে পারে, যা চীনের উৎপাদন খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। চীনের অর্থনীতি এখনো ব্যাপকভাবে উৎপাদননির্ভর, তাই জ্বালানির দাম বাড়লে মুনাফার মার্জিন কমে যেতে পারে।
ওয়াশিংটনের কৌশলগত হিসাব
বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউস এই সামরিক পদক্ষেপের কূটনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন। ইরানে হামলার প্রস্তুতির সময়ই ট্রাম্পের চীন সফরের সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের অপেক্ষায় আছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ইরান ইস্যুতে চীন সরাসরি সামরিক সহায়তা দেবে না। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ততা স্বল্পমেয়াদে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সামরিক পদক্ষেপকে উৎসাহিত করবে—এমন আশঙ্কাও তারা করছেন না।
তবে একটি উদ্বেগ রয়ে গেছে। দীর্ঘমেয়াদে যদি যুক্তরাষ্ট্র গোলাবারুদের মজুত দ্রুত পুনর্গঠন করতে না পারে, তাহলে তাইওয়ান ইস্যুতে প্রতিরোধক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হতে পারে।

বেইজিংয়ের সম্ভাব্য কৌশল
চীনের বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতির মোকাবিলায় বেইজিং সরাসরি সংঘাতে যাবে না। বরং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি হলে সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অস্থির ও ঝুঁকিপূর্ণ’ নীতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরবে।
চীনা কর্মকর্তারা ইরানকে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছেন না বলেও ইঙ্গিত মিলেছে। পশ্চিমা বিশ্বের ‘চীন-ইরান জোট’ ধারণাকে তারা অতিরঞ্জিত বলেই মনে করেন।
ইরানে সামরিক অভিযান ট্রাম্পকে তাৎক্ষণিকভাবে কূটনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যে জড়িয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে চীন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে হিসাবি দূরত্ব বজায় রেখে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প-শি বৈঠক হলে তা হবে এক জটিল বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণের পরীক্ষা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















