যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে নতুন যুদ্ধের মাত্র তৃতীয় দিন। কিন্তু এই অল্প সময়েই সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপর ইরানের হামলা পরিস্থিতিকে আরও বিস্তৃত করেছে। একই সঙ্গে ব্রিটেন তাদের ঘাঁটি ব্যবহারে আপত্তি সরিয়ে নেওয়ায় যুদ্ধের পরিধি আরও বেড়েছে। প্রতিদিনই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হচ্ছে, বিমান ভূপাতিত হচ্ছে, আর প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে। তবু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর এখনও অজানা—এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে।
যুদ্ধের শুরুতেই অনিশ্চয়তার ছায়া
যুদ্ধের তৃতীয় দিনেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। মার্কিন সামরিক সূত্র বলছে, একাধিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। হামলা ও পাল্টা হামলার মধ্যেই প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে বাস্তবতা। যুদ্ধ একবার শুরু হলে তাকে থামানো কঠিন—ইতিহাস সেটাই বলে। এখন প্রত্যেক পক্ষই নিজের মতো করে ‘জয়’ কল্পনা করছে।

ট্রাম্পের বিজয়ের সংজ্ঞা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ ঘোষণার পর আত্মবিশ্বাসী সুরে জানিয়েছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা হবে, নৌবাহিনী ভেঙে দেওয়া হবে এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিশ্চিহ্ন করা হবে। তার দাবি, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি হয়ে উঠেছিল।
তিনি আরও বলেন, ইরানের জনগণ চাইলে এখনই সরকার বদলের সুযোগ নিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে—এবার সেই সুযোগ এসেছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে শক্তিশালী কোনো রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের নজির ইতিহাসে খুব কম। ইরাক বা লিবিয়ার অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা এক বড় জুয়া বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। বোমাবর্ষণই যে শাসন পরিবর্তনের পথ খুলে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
নেতানিয়াহুর হিসাব
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানের জনগণকে বিদ্রোহে উৎসাহিত করেছেন। তবে তার মূল লক্ষ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া। বহু বছর ধরে তিনি ইরানকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে বিবেচনা করে আসছেন।
তার বক্তব্য, এই যুদ্ধের লক্ষ্য ‘সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থা’ সম্পূর্ণভাবে চূর্ণ করা। দেশীয় রাজনীতিতেও এই যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। সামনের নির্বাচনে বড় জয় পেতে হলে ইরানের বিরুদ্ধে স্পষ্ট সাফল্য প্রয়োজন নেতানিয়াহুর।

ইরানের টিকে থাকার লড়াই
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনা শাসনব্যবস্থার জন্য বড় আঘাত। তবু বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাষ্ট্র কাঠামো এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। প্রায় পাঁচ দশক ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ড মোকাবিলার মতো করে সাজানো।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও বাসিজ মিলিশিয়া শক্তিশালী ও সংগঠিত। তাদের লক্ষ্য শাসনব্যবস্থা রক্ষা করা। অতীতে বিক্ষোভ দমনে কঠোরতা দেখিয়েছে এই বাহিনী। তাই কেবল শীর্ষ নেতৃত্ব হারালেই যে পুরো ব্যবস্থার পতন ঘটবে, তা নিশ্চিত নয়।
শিয়া মতাদর্শে শহীদ হওয়ার ধারণা শক্তভাবে প্রোথিত। খামেনির মৃত্যু রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ‘শহীদত্ব’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হাজারো সমর্থক রাস্তায় নেমে শোক প্রকাশ করেছে।

অতীতের অশনি সংকেত
ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের পর দেশ ভেঙে পড়ে অস্থিরতায়। পশ্চিমা শক্তিগুলো দ্রুত সরে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ইরান আয়তনে বড়, জনসংখ্যাও প্রায় নয় কোটির বেশি। যদি শাসনব্যবস্থা হঠাৎ ভেঙে পড়ে, তবে বিশৃঙ্খলা ও রক্তক্ষয় ভয়াবহ হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কোন পথে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা বড় আঘাত পেয়েছে। তবে শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে। অধিকাংশ ইরানি হয়তো পরিবর্তন চাইতে পারেন, কিন্তু শক্তি প্রয়োগে পতনের পর স্থিতিশীল বিকল্প গড়া অত্যন্ত কঠিন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বাস, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে আরও নিরাপদ করবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সম্ভাবনার চেয়ে ঝুঁকিই এখন বেশি দৃশ্যমান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















