একসময় শিল্পকারখানার পতন আর জনশূন্যতার জন্য পরিচিত ছিল আমেরিকার মধ্যপশ্চিমাঞ্চল। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দীর্ঘদিনের সেই ধারা বদলাতে শুরু করেছে। মানুষ আবার ফিরছে ইলিনয়, মিশিগান, ওহাইওর মতো অঙ্গরাজ্যে। জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনের দাম এবং কাজের সুযোগ—সব মিলিয়ে নতুন করে আকর্ষণ তৈরি হয়েছে এই অঞ্চলে।
রকফোর্ডের বদলে যাওয়া ছবি
ইলিনয়ের রকফোর্ড শহর একসময় ধুঁকতে থাকা শিল্পনগরী হিসেবেই পরিচিত ছিল। প্রায় দেড় লাখ মানুষের এই শহরে পরিত্যক্ত কারখানা আর ফাঁকা পার্কিং লটের দৃশ্যই যেন বাস্তবতা। কিন্তু ভেতরের চিত্র ভিন্ন। পুরনো একটি কারখানা এখন আধুনিক হোটেল। বিনামূল্যের শিল্প জাদুঘরে বিখ্যাত শিল্পীর চিত্রকর্ম রয়েছে।বিমানবন্দরে কাজ করছেন প্রায় আট হাজার সাতশো মানুষ, যা এক দশক আগের তুলনায় কয়েক হাজার বেশি। শহর ঘিরে গড়ে উঠেছে উৎপাদনকেন্দ্রিক শিল্পগুচ্ছ।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে জনসংখ্যায়। দুই হাজার চব্বিশ সালে অন্য অঙ্গরাজ্যে যাওয়া মানুষের সংখ্যা আসা মানুষের চেয়ে সামান্য বেশি হলেও, আগের মতো বছরে দুই থেকে তিন হাজার মানুষের নিট প্রস্থান আর নেই। দুই হাজার পঁচিশ সালে শহরটি হয়তো আর্থিক মন্দার পর প্রথমবারের মতো নিট জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেখতে পারে।

মধ্যপশ্চিমে উল্টো স্রোত
ডাকোটা থেকে ওহাইও পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্যপশ্চিমাঞ্চলে গত বছর দেশীয় অভিবাসনে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। দুই হাজার বাইশ সালে যেখানে প্রায় এক লাখ আশি হাজার মানুষ অঞ্চলটি ছেড়েছিলেন, গত বছর সেখানে নিটভাবে মানুষ বেড়েছে। গবেষকদের মতে, এটি কয়েক দশকের মধ্যে বিরল ঘটনা।
ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্ট। দুই হাজার বাইশ সালে প্রায় দেড় লাখ মানুষ অন্যত্র চলে গেলেও, গত বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে চল্লিশ হাজারে। এতে রাজ্যের আর্থিক চাপ কিছুটা কমতে পারে, কারণ দীর্ঘদিন ধরে পেনশন ও ঋণ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছিল।
ডেট্রয়েট ও ক্লিভল্যান্ডের পুনরুত্থান
প্রায় সত্তর বছর পর ডেট্রয়েট শহরের মোট জনসংখ্যা বেড়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ক্লিভল্যান্ডেও জনসংখ্যা হ্রাসের গতি কমেছে। যদিও একই অঙ্গরাজ্যের কলম্বাসে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে, যেখানে আগে ব্যাপক মানুষ আসলেও এখন সামান্য প্রস্থান বাড়ছে।
কেন বাড়ছে আগ্রহ

বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ জীবনযাত্রার ব্যয়। দক্ষিণ ও পশ্চিমের দ্রুতবর্ধনশীল শহরগুলিতে বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম অনেক বেড়ে গেছে। তুলনায় শিকাগো বা রকফোর্ডে কম খরচে বাড়ি কেনা সম্ভব। দুই লাখ ডলারের কাছাকাছি দামে উঠান ও গ্যারেজসহ বাড়ি পাওয়া যায়। অনেক এলাকায় গাড়ি ছাড়াও চলাফেরা সম্ভব, সাংস্কৃতিক সুযোগও রয়েছে।
গত এক দশকে শিকাগো থেকে কর্মজীবী ও কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের বড় অংশ দক্ষিণে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু দক্ষিণের রাজ্যগুলো আর আগের মতো সস্তা নেই, মজুরিও তেমন বেশি নয়। মধ্যপশ্চিমে উৎপাদনশিল্পে মজুরি বাড়ার প্রবণতাও কিছুটা ভূমিকা রেখেছে।
তবু শঙ্কা রয়ে গেছে
এই উল্টো স্রোত স্থায়ী হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়। কঠিন শীত এখনো বড় বাধা। উৎপাদনশিল্পও আবার চাপে পড়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অভিবাসন কমে যাওয়ায় নতুন কর্মী সরবরাহ কমেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির জাতীয় পূর্বাভাসও কমিয়ে আনা হয়েছে। ফলে এক অঞ্চলের বৃদ্ধি মানে অন্য অঞ্চলের সংকোচন—এমন বাস্তবতা সামনে আসছে।
আমেরিকার অভিবাসন মানচিত্রে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তা সাময়িক নাকি দীর্ঘস্থায়ী—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















