ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের টানা তিন দিনের সামরিক হামলার পরও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিক কী অর্জন করতে চান এবং যুদ্ধ শেষে ইরানের ভবিষ্যৎ কেমন হবে—সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মিলছে না। হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভিন্ন ভিন্ন বার্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দুই দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানে নামার পর প্রথম দিকে বলা হয়েছিল, লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যাখ্যা বদলাতে শুরু করেছে।
যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তবতা
হোয়াইট হাউসে সাম্প্রতিক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, নৌবাহিনী, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন ধ্বংস করতে চায়। তাঁর দাবি, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
তবে যুদ্ধ শেষে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো কী হবে, বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে কি না—এসব প্রশ্নে তিনি নির্দিষ্ট কিছু বলেননি। হামলার শুরুর পর এক পর্যায়ে তিনি ইরানিদের নিজেদের সরকার “ফিরে নেওয়ার” আহ্বান জানান, যা অনেকেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনের অবসানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন।
শাসন পরিবর্তন নিয়ে দ্বৈত বার্তা
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধ নয়। তাঁর ভাষায়, লক্ষ্য নির্দিষ্ট সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা। কিন্তু ট্রাম্পের কিছু মন্তব্যে শাসনব্যবস্থার পতনের ইঙ্গিত মিলেছে। এই ভিন্ন সুর কংগ্রেসে বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছেন, ইরানে ঘোষিত সামরিক লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে হতাহতের ঝুঁকিও বাড়বে। ইতোমধ্যে ইরানের পাল্টা হামলায় কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। জর্ডান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
প্রাক্প্রতিরোধমূলক হামলার দাবি
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইসরায়েল হামলা চালাতে যাচ্ছে—এমন তথ্য পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই পদক্ষেপ নেয়, যাতে সম্ভাব্য বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়। তাঁর দাবি, আগেভাগে হামলা না করলে মার্কিন বাহিনীর ক্ষতি আরও বেশি হতে পারত।
এই ব্যাখ্যা যুদ্ধের নতুন যুক্তি হিসেবে সামনে এসেছে, যা আগের ঘোষিত পারমাণবিক ইস্যুর বাইরে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
কংগ্রেসে সমালোচনা
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা অভিযোগ করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কতটা অগ্রসর হয়েছিল বা তাৎক্ষণিক হুমকি কতটা বাস্তব ছিল—সে বিষয়ে পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। তাঁদের আশঙ্কা, স্পষ্ট কৌশল ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, ইরানের ভেতরে গণঅভ্যুত্থানের আহ্বান ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর দমন-পীড়ন চালাতে পারে।
যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা
ট্রাম্প বলেছেন, এই যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে, আবার প্রয়োজন হলে আরও দীর্ঘ সময়ও স্থায়ী হতে পারে। তবে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়ে আপাতত তিনি নিশ্চয়তা দিলেও ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সেই পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তায় স্পষ্ট রূপরেখার অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইরানে হামলার চূড়ান্ত লক্ষ্য, শাসন পরিবর্তনের প্রশ্ন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী কৌশল—সবকিছু নিয়েই রয়ে গেছে অনিশ্চয়তা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















