চীনের অর্থনীতি যখন সম্পত্তি বাজার ধস, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যপতন আর উচ্চ যুব বেকারত্বের চাপে হাঁপাচ্ছে, ঠিক তখনই একদল তরুণ নীরবে বদলে দিচ্ছে সাফল্যের সংজ্ঞা। শি জিনপিং যাদের বলেন ‘নংচাওয়ার’—অর্থাৎ যারা সময়ের ঢেউয়ে চড়ে এগিয়ে যায়। আজকের সেই ঢেউ বইছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও কৌশলগত প্রযুক্তির দিকে। আর সেই ঢেউয়ে ভেসেই গড়ে উঠছে নতুন ধনী শ্রেণি।
অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেও নতুন উত্থান
গত কয়েক বছরে চীনের আবাসন খাত গড়ে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মূল্য হারিয়েছে। বহু মানুষের সম্পদ কমেছে, আয় স্থবির। যুব বেকারত্ব প্রায় সতেরো শতাংশে ঘোরাফেরা করছে। অনেক তরুণ অস্থায়ী কাজ কিংবা অনিশ্চিত জীবিকার দিকে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ আবার কঠিন চাকরির প্রতিযোগিতা এড়িয়ে জীবনকে ধীর গতিতে নেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন।
কিন্তু একই সময়ে কৌশলগত প্রযুক্তি খাতে তৈরি হয়েছে এক নতুন সম্ভাবনার জগৎ। শি জিনপিংয়ের উন্নয়ন ভাবনায় প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এখন কেন্দ্রে। ফলে রাষ্ট্রের নীতি, অর্থায়ন ও দিকনির্দেশনা—সবকিছু ঘুরছে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের চারপাশে।

নতুন প্রজন্মের ‘নংচাওয়ার’ কারা
আগের দশকগুলোতে চীনে ধনী হওয়ার পথ ছিল ভিন্ন। নিম্নমানের উৎপাদন, ই-কমার্সের উত্থান কিংবা সম্পত্তি বাজারের বুম—এসব ক্ষেত্র থেকে তৈরি হয়েছিল বহু কোটিপতি। তখন উচ্চশিক্ষা না থাকলেও সাফল্য সম্ভব ছিল।
কিন্তু আজকের চিত্র আলাদা। এখনকার সাফল্য নির্ভর করছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক উচ্চশিক্ষার ওপর। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাশ করা তরুণরাই এগিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা, রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠান, ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ প্রযুক্তি কিংবা স্মার্ট ডিভাইস—এসব ক্ষেত্রেই তারা প্রতিষ্ঠা গড়ছেন।
শীর্ষ সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের বেতন গত কয়েক বছরে প্রকৃত অর্থে বছরে গড়ে আট শতাংশ করে বেড়েছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে মেধা দখলের লড়াইয়ে বেতন বেড়েছে দ্রুত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষকদের কেউ কেউ বছরে কোটি টাকার বেশি আয় করছেন, যা গড় সাদা কলার কর্মীর আয়ের বহু গুণ।
সরকারই সবচেয়ে বড় ভরসা

এক সময় প্রযুক্তি খাতকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু এখন কৌশলগত শিল্পে রাষ্ট্র নিজেই বড় পৃষ্ঠপোষক। গবেষণা ও উন্নয়নে ভর্তুকি, অফিস ভাড়া সহায়তা, বিদেশি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার খরচ—সবই দিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পেটেন্ট নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা ঠেকাতেও প্রশাসন ভূমিকা রাখছে।
বেইজিংয়ের প্রযুক্তি অঞ্চল, শেনজেনের ইলেকট্রনিক্স কেন্দ্র ও হাংঝৌ—এই কয়েকটি শহরেই বেশি দেখা যায় এই নতুন তরুণ উদ্যোক্তাদের। অফিসে আধুনিক পরিবেশ থাকলেও দেয়ালে শোভা পায় সরকারি স্বীকৃতি আর দলীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তোলা ছবি। প্রযুক্তি আর রাষ্ট্র যেন একই স্রোতে মিলেছে।
রাষ্ট্রনির্দেশিত উদ্ভাবনের ঝুঁকি
তবে এই মডেলের ঝুঁকিও কম নয়। কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত অগ্রাধিকার সব সময় বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে মিলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ভর্তুকি তুলে নেওয়া হলে অনেক প্রতিষ্ঠান ধাক্কা খেতে পারে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো গত এক দশকে কোটি কোটি চাকরি কমিয়েছে, যার পেছনে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ভূমিকা বড়।

তারপরও শি জিনপিং বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা ছাড়া আধুনিক শক্তিধর রাষ্ট্র গড়া সম্ভব নয়। তরুণ ‘নংচাওয়ার’দের সঙ্গে তাঁর বৈঠক সেই বার্তাকেই জোরালো করেছে। অনেকের ভাষায়, রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মানেই স্থিতিশীলতা।
চীনের নতুন সাফল্যের মানচিত্র
সব মিলিয়ে চীনে ধনী হওয়ার পুরোনো সূত্র বদলে গেছে। এখন সম্পদ গড়ার চাবিকাঠি জমি বা সম্পর্ক নয়, প্রযুক্তি দক্ষতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সের মতো খাতে যাঁরা সময়ের ঢেউ ধরতে পারছেন, তাঁরাই হচ্ছেন নতুন বিজয়ী।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















