চীনের বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ ধাতু বাজারে দীর্ঘদিনের প্রভাব ভাঙতে এবার সরাসরি রাষ্ট্রীয় শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে আমেরিকা। আফ্রিকা থেকে লাতিন আমেরিকা, মধ্য এশিয়া থেকে ইউরোপ—বিশ্বজুড়ে খনিজ সম্পদ নিশ্চিত করতে শুরু হয়েছে এক নতুন ভূরাজনৈতিক দৌড়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু অর্থনীতির লড়াই নয়, বরং সামরিক ও প্রযুক্তিগত আধিপত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।
কঙ্গোতে নতুন কৌশল, বিশ্বজুড়ে চুক্তির বন্যা
গত তিন দশক ধরে যেখানে পশ্চিমা কোম্পানিগুলো কঙ্গো ছেড়ে বেরিয়ে গেছে, সেখানে এখন আমেরিকান সংস্থাগুলো আগ্রহী হয়ে উঠছে। কঙ্গোর খনি খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব প্রায় নব্বই শতাংশ বলে ধারণা করা হয়। এই বাস্তবতায় আমেরিকা খনি ও অনুসন্ধান প্রকল্পে অগ্রাধিকার অধিকার নিশ্চিত করছে।
কঙ্গোর তামা অঞ্চল থেকে আটলান্টিক উপকূল পর্যন্ত রেলপথ উন্নয়নে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে, যাতে দ্রুত খনিজ পরিবহন সম্ভব হয়। একই সঙ্গে তামা ও কোবাল্ট খনিতে বড় অঙ্কের অংশীদারিত্ব নেওয়ার চুক্তিও হয়েছে। আর্জেন্টিনা থেকে উজবেকিস্তান পর্যন্ত একাধিক দেশের সঙ্গে খনিজভিত্তিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা হয়েছে।

কেন এত তাড়া
কম্পিউটিং, বিদ্যুতায়ন, মহাকাশ প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ত্রিশ থেকে ষাট ধরনের ধাতুকে এখন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তামার মতো বহুল ব্যবহৃত ধাতু থেকে শুরু করে ভারী বিরল মাটি ধাতু—সবই আধুনিক অর্থনীতির স্তম্ভ।
গত বছর চীন সাত ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিরল মাটি ধাতু রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করলে ইউরোপ ও এশিয়ার শিল্পখাতে ধাক্কা লাগে। যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, রাডার ও বৈদ্যুতিক মোটরের সরবরাহ শৃঙ্খল হুমকির মুখে পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই তীব্র হয় যে শুল্কনীতি পর্যন্ত পুনর্বিবেচনা করতে হয়।
চীনের কৌশল, বাজার দখলের দীর্ঘ ইতিহাস
দেং শিয়াওপিং বহু আগে বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে তেল আছে, চীনের আছে বিরল মাটি। চার দশক ধরে ভর্তুকি, সস্তা ঋণ এবং ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে চীন খনিজ উত্তোলন ও পরিশোধন খাতে প্রায় একচেটিয়া অবস্থান তৈরি করেছে। দাম কমিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী খনি বন্ধ করে দেওয়ার কৌশলও বহুবার ব্যবহার করেছে তারা।
ক্যালিফোর্নিয়ার ঐতিহাসিক একটি বিরল মাটি খনি কম দামের চীনা পণ্যের চাপে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে সেটি পুনরায় চালু হলেও বহু খনি চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে গেছে। লিথিয়ামের দাম পড়ে গেলে একই কৌশলে পশ্চিমা প্রকল্পগুলো বিপাকে পড়ে।

রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের তিন স্তম্ভ
এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকা সরাসরি ঋণ, বিনিয়োগ ও ভর্তুকি দিয়ে নতুন খনি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিলিয়ন ডলারের অর্থ সহায়তা দিয়েছে। বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে উৎপাদিত খনিজ চীনে না যায়।
দ্বিতীয়ত, জাতীয় মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বেসামরিক শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি খনিজ ভান্ডার তৈরির উদ্যোগ চলছে, যাতে সংকটের সময় সরবরাহ নিশ্চিত থাকে।
তৃতীয়ত, দামপতনের ঝুঁকি এড়াতে ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণের নীতি নেওয়া হয়েছে। বাজারে চীন কম দামে পণ্য ছেড়ে দিলে যাতে দেশীয় খনি বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য নির্দিষ্ট দামের নিচে বিক্রি হলে সরকার পার্থক্য পরিশোধ করবে।
মিত্রদের ভিন্ন পথ

ইউরোপীয় দেশগুলো চীনা আমদানি কমাতে লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও অর্থায়ন তুলনামূলক কম। জাপান অতীতে চীনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়ে বিদেশি খনিতে অংশীদারিত্ব নিয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। তবে অনেক দেশই মুক্তবাজার নীতির পক্ষে থেকে সরাসরি মূল্য নিয়ন্ত্রণে অনীহা দেখাচ্ছে।
ঝুঁকি ও সংশয়
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এত বিস্তৃত খনিজ তালিকায় একযোগে হস্তক্ষেপ করলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বড় খনি প্রকল্পে বিলিয়ন ডলার লাগে, সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই বরাদ্দ অর্থ তুলনামূলক কম। দুর্নীতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো পরিশোধন খাত। কাঁচামাল উত্তোলন বাড়ালেও অধিকাংশ ধাতু শেষ পর্যন্ত পরিশোধনের জন্য চীনে পাঠাতে হয়। ফলে চীনের প্রভাব পুরোপুরি কাটানো কঠিন।
সব মিলিয়ে খনিজ যুদ্ধে আমেরিকার এই রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে পরিষ্কার যে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এখন বৈশ্বিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















