পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্তজুড়ে নতুন করে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। গোলাবর্ষণ, মর্টার হামলা এবং বিমান হামলায় দুই দেশের সম্পর্ক আবারও খাদের কিনারায়। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে, এখন এটি ‘খোলা যুদ্ধ’। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলকে অস্থির করে তুলতে পারে।
সীমান্তে রাতভর হামলা
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আফগান তালেবান বাহিনী বিতর্কিত ও দুর্গম সীমান্তের বিভিন্ন অংশে পাকিস্তানি অবস্থানে হামলা চালায়। কাবুলের দাবি, সপ্তাহান্তে আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বোমা হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবেই এই আক্রমণ।
এর জবাবে শুক্রবার ভোরে পাকিস্তান ‘গাজব লিল হক’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। কাবুল, পাকতিয়া ও কান্দাহারসহ একাধিক এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়। কান্দাহারকে তালেবানদের আধ্যাত্মিক ঘাঁটি হিসেবে ধরা হয়।

বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ
তালেবানের মুখপাত্রের দাবি, পাকিস্তানের হামলায় ১৯ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগ নারী ও শিশু। অন্যদিকে পাকিস্তান বলছে, তারা আফগান প্রতিরক্ষা স্থাপনায় আঘাত হেনেছে এবং সীমান্তে ৭৩টি তালেবান চৌকি ধ্বংস করেছে।
কাবুলের এক বাসিন্দা জানান, ভোররাতে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে তার পরিবার ঘুম থেকে জেগে ওঠে। জানালার বাইরে আগুনের ঝলকানি ও গুলির শব্দে পুরো শহর আতঙ্কে ছিল। অনেক বাড়ির আলো রাতভর জ্বলে ছিল, মানুষ আশঙ্কায় কাটিয়েছে দীর্ঘ রাত।
হতাহতের পরিসংখ্যান নিয়ে দ্বন্দ্ব
পাকিস্তানের দাবি, তাদের অভিযানে ২৭৪ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত ও ৪০০ জন আহত হয়েছে। আফগানিস্তান বলছে, তাদের ১৩ সেনা নিহত ও ২২ জন আহত। একই সঙ্গে তালেবান পক্ষ দাবি করেছে, তারা ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে। দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র হওয়ায় এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
পটভূমি ও উত্তেজনার শিকড়
দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক থাকলেও ইতিহাস জুড়ে সম্পর্ক জটিল। গত অক্টোবরেও বড় সংঘর্ষ হয়েছিল, যার পর ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল।

আফগান তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানে জঙ্গি হামলা বেড়েছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে, পাকিস্তানি তালেবান জঙ্গিরা আফগান ভূখণ্ডে আশ্রয় পাচ্ছে। কাবুল তা অস্বীকার করলেও সাম্প্রতিক ঘটনায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
২০২৫ সালে পাকিস্তানে জঙ্গি হামলায় ১২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে দেশটির সামরিক বাহিনীর তথ্য। ২০২১ সালের তুলনায় এই সংখ্যা দ্বিগুণ।
সামরিক শক্তির বৈষম্য
পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। তাদের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী মিলিয়ে সক্রিয় সদস্য প্রায় ছয় লাখ ষাট হাজার। আধুনিক যুদ্ধবিমান ও সমরাস্ত্রে তারা শক্তিশালী।
অন্যদিকে আফগানিস্তানে তালেবানই একমাত্র সামরিক শক্তি, যার সদস্যসংখ্যা দুই লাখের কম। পূর্ণাঙ্গ বিমানবাহিনী নেই, তবে গেরিলা কৌশল ও আত্মঘাতী হামলায় তারা অভিজ্ঞ।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অতীতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় উত্তেজনা কমেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি যদি আরও বাড়ে, তা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়াবে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আফগান পক্ষ প্রতিশোধ নিলে তা পাকিস্তানের শহরাঞ্চলে হামলার রূপ নিতে পারে। ড্রোন ও আত্মঘাতী হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















