ওয়াশিংটনে ক্ষমতার বাইরে থেকে হতাশ ডেমোক্র্যাটদের জন্য গত কয়েক মাস কিছুটা আশার আলো এনে দিয়েছিল। আদর্শিক বিভাজনে প্রায়ই দুর্বল হয়ে পড়া দলটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে একজোট ছিল, বিশেষ করে মিনিয়াপোলিসে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনার পর।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ডেমোক্র্যাটরা অল্প কয়েকটি আসনের ব্যবধানে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আশায় রয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি এবং দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনার মাধ্যমে হোয়াইট হাউসকে রক্ষণাত্মক অবস্থায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল তারা।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ইরান হামলা সেই ঐক্যের স্থায়িত্বকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ইরান হামলা ও দলীয় অবস্থান
সপ্তাহান্তে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা একদিকে তার নিন্দা জানায়, অন্যদিকে কংগ্রেসে দ্রুত একটি যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব পাসের দাবি তোলে, যা প্রেসিডেন্টের সামরিক পদক্ষেপের ক্ষমতা সীমিত করবে।
ইলিনয়ের এভানস্টনের মেয়র এবং কংগ্রেসে প্রার্থী ড্যানিয়েল বিস বলেন, ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে শক্ত, স্পষ্ট ও ঐক্যবদ্ধ বিরোধী দল প্রয়োজন।
তবে দলীয় ভেতরে ভিন্নমতও সামনে আসছে। ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ় সমর্থনকারী কয়েকজন ডেমোক্র্যাট যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। ওহাইওর প্রতিনিধি গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান ইরান সংক্রান্ত প্রস্তাবে সমর্থন দিচ্ছেন না। আঘাতের আগেই নিউ জার্সির প্রতিনিধি জশ গটহাইমারও জানিয়েছিলেন, তিনি এর বিরুদ্ধে ভোট দেবেন।
পেনসিলভানিয়ার সিনেটর জন ফেটারম্যানও দলীয় অবস্থান থেকে সরে এসে বলেন, এই হামলা অবৈধ ছিল—এমন দাবি তিনি মানেন না। এতে দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিজ প্রকাশ্যে বলেছেন, ফেটারম্যানের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও প্রশ্ন
অন্যদিকে রিপাবলিকান শিবিরেও অস্বস্তি রয়েছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমর্থকদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, দীর্ঘদিনের সামরিক হস্তক্ষেপবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে এই হামলা কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। স্পষ্ট প্রস্থান কৌশল তিনি তুলে ধরেননি এবং সম্ভাব্য মার্কিন হতাহতের আশঙ্কার কথাও বলেছেন। এতে ভোটারদের ধৈর্যের ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও রাজনৈতিক ঝুঁকি
ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এতে ট্রাম্প সাধারণ মানুষের আর্থিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন—ডেমোক্র্যাটদের এমন অভিযোগ আরও জোরালো হতে পারে।
তবে ইসরায়েল ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটদের পুরনো বিভাজনও আবার সামনে আসতে পারে। গাজা যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ইসরায়েলপন্থী অবস্থান তরুণ ভোটারদের একাংশকে ক্ষুব্ধ করেছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনে কমলা হ্যারিস প্রার্থী হওয়ার পরও এই ক্ষোভ পুরোপুরি কাটেনি।
প্রগতিশীল সংগঠন আওয়ার রেভল্যুশনের রাজনৈতিক পরিচালক প্যাকো ফ্যাবিয়ান বলেন, ডেমোক্র্যাটরা একক সত্তা নয়, ভেতরে নানা মত রয়েছে। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবির প্রভাব নিয়ে দলীয় ঘরানায় নতুন সচেতনতা তৈরি হচ্ছে।
নিউ জার্সির সাম্প্রতিক বিশেষ নির্বাচনে ইসরায়েলপন্থী রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুপার প্যাক মধ্যপন্থী প্রার্থী টম ম্যালিনোস্কিকে ঠেকাতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রগতিশীল প্রার্থী আনালিলিয়া মেজিয়া প্রাইমারিতে জয়ী হন। অনেকের মতে, এতে লবিংয়ের প্রভাব উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
জনমত কোন দিকে

গ্যালাপের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, কয়েক বছর আগে যেখানে অধিকাংশ আমেরিকান ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, এখন সমর্থন প্রায় সমানভাবে বিভক্ত। উল্লেখযোগ্য অংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতিও সমান সহানুভূতি প্রকাশ করছেন।
ইরানে বিমান হামলা নিয়ে প্রাথমিক জরিপেও বিরোধিতার সুর স্পষ্ট। এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ছয়জনের মধ্যে চারজন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক এই সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। আরেক জরিপে প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা হামলার বিরোধিতা করেন, সমর্থন করেন তুলনামূলক কমসংখ্যক মানুষ।
ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যেই অসন্তোষ বেশি দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের মধ্যে সমর্থন বেশি। বেশিরভাগ আমেরিকান মনে করেন, ইরানে আরও সামরিক পদক্ষেপের আগে প্রেসিডেন্টের কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া উচিত।
প্রাইমারি নির্বাচনে প্রভাব
এই হামলার রাজনৈতিক প্রভাব দ্রুতই দেখা যেতে পারে চলতি বছরের প্রথম প্রাইমারি নির্বাচনে।
নর্থ ক্যারোলিনায় কাউন্টি কমিশনার নিদা আলাম দুই মেয়াদের কংগ্রেস সদস্য ভ্যালেরি ফাউশিকে চ্যালেঞ্জ করছেন। আগের নির্বাচনে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীর সমর্থন পাওয়া ফাউশি এবার সেই অনুদান নেননি এবং বলেছেন, তিনি ট্রাম্পের ‘অবৈধ যুদ্ধ’ সমর্থন করেন না।

অন্যদিকে আলাম ভোটের আগে ভিডিও বার্তায় ট্রাম্পকে ‘আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধ শুরু করার’ অভিযোগ এনে ইসরায়েলপন্থী লবির সমর্থন কখনও গ্রহণ করবেন না বলে অঙ্গীকার করেন।
ইলিনয়ে মার্চের প্রাইমারির আগে এভানস্টনের মেয়র ড্যানিয়েল বিসকেও ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো সমালোচনা করেছে। বিস দাবি করেন, তার এলাকায় অনেক ভোটার ইসরায়েলপন্থী অর্থায়ন ও ট্রাম্পঘনিষ্ঠ নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
এদিকে সংশ্লিষ্ট একটি সুপার প্যাকের মুখপাত্র প্যাট্রিক ডর্টন বলেন, মূল পার্থক্য হবে—কে ইরানকে দমনমূলক ও সহিংস শাসনব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন এবং কে তাদের কর্মকাণ্ড উপেক্ষা করছেন।
সব মিলিয়ে, ইরান ইস্যুতে সামরিক পদক্ষেপ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও নতুন করে নাড়া দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের সাম্প্রতিক ঐক্য এই পরীক্ষায় টিকে থাকবে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















