মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফরকে সামনে রেখে বেইজিং ও ওয়াশিংটন পারস্পরিক বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবনের উপায় নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য এই বিনিয়োগ চুক্তি ট্রাম্পের সফরের কয়েকটি দৃশ্যমান সাফল্যের অন্যতম হতে পারে। সফরটি ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিলের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
কর্মপর্যায়ের প্রস্তুতি ও আলোচনার অগ্রগতি
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সফরের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে কর্মপর্যায়ের কর্মকর্তারা বিনিয়োগ ইস্যুটি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেছেন। তবে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিসর, কাঠামো ও কার্যপদ্ধতি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
একটি সূত্র জানায়, উভয় পক্ষই এমন যৌথ উদ্যোগ, লাইসেন্সিং চুক্তি এবং তুলনামূলকভাবে কম মেধাস্বত্বনির্ভর মডেলের দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছে, যেগুলো রাজনৈতিক ও নিয়ন্ত্রক পর্যায়ের কঠোর নজরদারির মধ্যেও টিকে থাকতে সক্ষম হবে।

ফোর্ড-ক্যাটল মডেল হতে পারে দৃষ্টান্ত
একজন সূত্র উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালে মার্কিন গাড়ি নির্মাতা ফোর্ড ও চীনা ব্যাটারি প্রস্তুতকারক কনটেম্পোরারি অ্যামপেরেক্স টেকনোলজির মধ্যে হওয়া চুক্তি একটি সম্ভাব্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। ওই চুক্তিতে ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রে একটি কারখানার জন্য লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারি প্রযুক্তি লাইসেন্স নেয়।
তবে এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্কও সৃষ্টি করে। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের চীনবিষয়ক বিশেষ কমিটির চেয়ারম্যান জন মুলেনার ফোর্ডের প্রধান নির্বাহী জিম ফারলির কাছে চিঠি পাঠিয়ে জানতে চান, নতুন যোগ্যতা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ জারির পর লাইসেন্সিং চুক্তিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না। তিনি দাবি করেন, ক্যাটল পেন্টাগনের তালিকাভুক্ত একটি চীনা সামরিক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, যদিও কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক: কূটনৈতিক ভিত্তি
চীন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে বৃহত্তর কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে দেখে আসছে। প্রতিবছর শত শত বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রবাহ এই সম্পর্ককে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা বিনিয়োগের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ায় বিনিয়োগ কমেছে, এমনকি কিছু প্রকল্প বাতিলও হয়েছে। চীনা পক্ষ বিনিয়োগ সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রে চীনা কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং বিনিয়োগে বাধা নিয়েও আলোচনা তুলেছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিনিধিরা চীনা বাজারে প্রবেশাধিকারের বিষয়ে নিজেদের মতামত জানতে চেয়েছেন।

বিনিয়োগে পতনের চিত্র
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, যা ছিল রেকর্ড। কিন্তু ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। মোট সঞ্চিত বিনিয়োগ বর্তমানে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার।
গত অক্টোবরে চীনা ব্যাটারি নির্মাতা গোটিয়নের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান মিশিগানে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের একটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা বাতিল করে। চীনা মালিকানার কারণে কিছু আইনপ্রণেতার সমালোচনার মুখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে চীন তার বাজার আরও উন্মুক্ত করেছে। তবু যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফেরত নেওয়ার নীতি ও প্রযুক্তি খাতে বিধিনিষেধের কারণে কিছু মার্কিন প্রতিষ্ঠান চীন ছেড়েছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনে বাস্তবায়িত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
শুল্ক, সরবরাহ শৃঙ্খল ও পারস্পরিকতা
আরেকটি সূত্র জানায়, চীনা পক্ষ বিনিয়োগ সুরক্ষার পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খলের যন্ত্রাংশ ও উপকরণের ওপর আরোপিত শুল্ক বিষয়ে স্পষ্টতা দাবি করেছে। অপরদিকে, মার্কিন পক্ষ ‘নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য’ ও ‘পারস্পরিকতা’র নীতির ওপর জোর দিয়েছে।
সূত্রটি আরও জানায়, অ-সংবেদনশীল খাতে চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হতে পারে। তবে এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত ‘চীন হুমকি’ বয়ান কিছুটা নরম করতে হবে।

অনিশ্চয়তা ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠকে উভয় পক্ষই রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কাঠামোর মধ্যে বাণিজ্যিক ও আর্থিক সাফল্য অর্জনের আশা করছে। তবে ওয়াশিংটনের ইরানে সামরিক হামলার প্রেক্ষাপটে সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
একটি তৃতীয় সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিনিয়োগ চুক্তির সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব চীনের কাছে উপস্থাপন করেনি। ট্রাম্পের সফরের এক মাসেরও কম সময় বাকি থাকায় এই বিলম্ব উভয় পক্ষের মধ্যেই হতাশা তৈরি করেছে।
শিগগিরই দুই দেশের আলোচকরা নতুন দফা বৈঠকে বসতে পারেন, যেখানে সম্ভাব্য চুক্তির বিস্তারিত দিকগুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চীন সব ধরনের একতরফা শুল্ক আরোপের বিরোধিতা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এমন শুল্ক প্রত্যাহার ও ভবিষ্যতে আরোপ না করার আহ্বান জানায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















