ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চীনা রপ্তানিকারক ও বিনিয়োগকারীদের ওপর। যেসব ব্যবসায়ী ইরান ও আশপাশের অঞ্চলকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে দেখছিলেন, তাদের অনেকের পরিকল্পনা এখন অনিশ্চয়তায় আটকে গেছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, অর্ডার ঝুলে গেল
গত শনিবার থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর অনেক চীনা ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তাদের পণ্যবাহী চালান আটকে গেছে, অর্থপ্রদান বিলম্বিত হচ্ছে এবং ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
শেনঝেনভিত্তিক একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ডেভিড শি জানান, জানুয়ারির শেষ দিকে একটি ইরানি বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠানের ৫০ লাখ ইউয়ানের বেশি মূল্যের চুক্তি হয়। ইরানি প্রতিনিধিরা শেনঝেনের বিভিন্ন কারখানা ঘুরে পণ্য কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন। তারা অগ্রিম অর্থও পরিশোধ করেছিলেন এবং উৎপাদনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল।
কিন্তু হামলার পর থেকে তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। বার্তার জবাব মিলছে না। প্রকল্প স্থগিত হয়েছে নাকি বাতিল হয়েছে—তা নিয়েও কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই।

বেল্ট অ্যান্ড রোডে ইরানের গুরুত্ব
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশের প্রধান দ্বার হিসেবে বিবেচিত। তেল ছাড়াও চীন ও ইরানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।
ইরান থেকে চীন মূলত পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য, খনিজ ও ধাতব পণ্য আমদানি করে। অন্যদিকে চীন ইরানে রপ্তানি করে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, ভোক্তা পণ্য, গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন প্রস্তুত পণ্য।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, এই হামলা চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। এতে চীনা ব্যবসায়িক মহলে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
কৃষিযন্ত্র রপ্তানিতে ধসের আশঙ্কা
চীনের শানডং প্রদেশের এক কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারক ইয়েনো ইয়ান জানান, বর্তমানে ইরানি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ বছরের অর্ডারগুলো এগোনোর সম্ভাবনাও কম।
তার প্রতিষ্ঠান ২৫ অশ্বশক্তির ট্র্যাক্টর ইরানে রপ্তানি করে, যা তাদের মোট রপ্তানির প্রায় ৫ শতাংশ। কিন্তু এখন তারা এ বছরের বাকি সময়ের জন্য ইরানকে সম্ভাব্য বাজার হিসেবে ধরছেন না। বরং ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার মতো তুলনামূলক স্থিতিশীল বাজারে নজর দিচ্ছেন।
ইয়ানের মতে, ইরানে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে দেশটির ঘুরে দাঁড়াতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। হামলার আগেও দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা বড় সমস্যা ছিল।
জ্বালানি দামের চাপ ও উৎপাদন খরচ
যেসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি ইরানে রপ্তানি না করলেও পেট্রোলিয়ামজাত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, তারাও উদ্বিগ্ন। এক টেক্সটাইল রপ্তানিকারক স্টিভ শি জানান, তার ব্যবসায় কাঁচামালের দাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে চীনে সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক কাঁচামালের দামও দ্রুত বাড়তে পারে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে, মুনাফার মার্জিন কমবে এবং চীনের উৎপাদন খরচের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ঝুঁকি কমাতে তিনি গত বছরই উৎপাদনের একটি অংশ মিসরে সরিয়ে নিয়েছেন। তার মতে, চীনে পণ্য তৈরি করলেও তা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মিসর থেকে পণ্য সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় পাঠানো যায়, হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে। এছাড়া ভূমধ্যসাগর হয়ে তুরস্ক ও ইউরোপীয় বাজারেও পৌঁছানো সম্ভব, যা সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি নমনীয়তা দেয়।
ইরান এখন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বাজার
ঝেজিয়াং প্রদেশের সিশি শহরের এক ব্যবসায়ী লিয়াং বলেন, হামলার আগেও ইরান ছিল কঠিন বাজার। উচ্চ আমদানি শুল্ক ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষার নানা বাধার কারণে বাজারে প্রবেশ সহজ ছিল না।’

বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তার মতে, ইরান চীনের বেসরকারি ব্যবসার জন্য প্রায় ‘নিষিদ্ধ’ বাজারে পরিণত হতে পারে। সিশির ব্যবসায়ীরা নতুন বা উদীয়মান বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে সাধারণত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করেন।
আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে হংকংয়ের গুরুত্ব
গ্লোবাল সাসটেইনেবিলিটি সার্ভিসেস সেন্টারের পরিচালক ও আইএইচডিপে গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চিয়াং চুন-ইউয়ান, যার বিনিয়োগ রয়েছে হংকং ও মধ্যপ্রাচ্যে, বলেন—ইরান ও আশপাশের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে যেসব প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করত, তারাও নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে।
তার মতে, সংঘাতের কারণে স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দেবে। যদি মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক নিরাপদ আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে হংকংয়ের মতো জায়গার দিকে ঝুঁকতে পারে।
মোটকথা, ইরানে চলমান হামলা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, চীনের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ব্যবসায়ীরা এখন অপেক্ষায়—সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















