ভারতের শহরগুলোতে ভারী বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরও রাস্তায় জল জমে থাকে দিনের পর দিন। বিষয়টি প্রায়ই নিকাশি ব্যবস্থার ব্যর্থতা বা অতিবৃষ্টির ফল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু জলবিদ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা বলছে—ভূদৃশ্য বৃষ্টিকে তাৎক্ষণিকভাবে ভুলে যায় না; বরং অতীত বৃষ্টির স্মৃতি বহন করে। আর সেই ‘স্মৃতি’ই নির্ধারণ করে প্লাবনের ধরন ও স্থায়িত্ব।
কী এই ‘হাইড্রোলজিক্যাল হিস্টেরেসিস’?
হাইড্রোলজিক্যাল হিস্টেরেসিস বলতে বোঝায়—কোনো ভূখণ্ডের বর্তমান বৃষ্টিপাতের প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে শুধু আজকের বৃষ্টির ওপর নয়, আগের দিনগুলোর বৃষ্টির ওপরও। দীর্ঘ সময় ধরে মাটি, জলাধার, জলাভূমি ও বন্যাপ্রবণ সমতলে জল জমা হয় এবং তা ধীরে ধীরে নির্গত হয়। ফলে বৃষ্টিপাত ও নদীর প্রবাহের সম্পর্ক সরলরৈখিক নয়।
শুষ্ক মাটি প্রথমে স্পঞ্জের মতো পানি শোষণ করে। কিন্তু একবার স্যাচুরেটেড হলে সামান্য অতিরিক্ত বৃষ্টিও দ্রুত প্রবাহে রূপ নেয়। তখন বৃষ্টি বাড়ুক বা না বাড়ুক, প্লাবন দেখা দিতে পারে।
নদী কেন ভিন্নভাবে আচরণ করে
বর্ষাকালে নদীর জলস্তর বাড়লে প্রথমে তা চ্যানেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু একসময় নদী তীর উপচে পাশের সমতলভূমি ও জলাভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে। পানি তখন দ্রুতগতির চ্যানেল ছেড়ে ধীরগতির প্লাবনভূমিতে জমা হয়।
বৃষ্টি কমলেও এই জমা পানি তাৎক্ষণিকভাবে সরে যায় না। মাটির ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে নদীতে ফিরে আসে বা স্থির অবস্থায় থেকে যায়। ফলে একই জলস্তর উত্থানের সময় যে আচরণ করে, নামার সময় সেই আচরণ করে না—এটাই জলগত ‘স্মৃতি’।
বেঙ্গালুরুর উদাহরণ
২০২৪ সালের অক্টোবরে বেঙ্গালুরুর ইয়েলাহাঙ্কা অঞ্চলের কোগিলু ও দোদ্দাবোম্মাসান্দ্রা হ্রদ টানা বৃষ্টিতে উপচে পড়ে। প্রথমে মনে হয়েছিল হ্রদ পূর্ণ হয়ে যাওয়াই মূল কারণ। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার ‘পথনির্ভর’ প্রতিক্রিয়া।
হ্রদের পানি নির্দিষ্ট উচ্চতা অতিক্রম করলে তা পাশের সড়ক ও খোলা জমিতে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে ড্রেনেজ লাইন ডুবে যায়। বৃষ্টি কমলেও রাস্তায় জমা পানি দ্রুত নামেনি, কারণ মাটি স্যাচুরেটেড ছিল এবং প্রবাহের ঢাল কমে গিয়েছিল।
ঐতিহাসিকভাবে বেঙ্গালুরুর হ্রদগুলো প্রাকৃতিক খাল ও জলাভূমির মাধ্যমে সংযুক্ত ছিল। সময়ের সঙ্গে সেগুলো কংক্রিট চ্যানেলে রূপান্তরিত ও দখল হয়ে যাওয়ায় এখন পানি দ্রুত জমে, হঠাৎ উপচে পড়ে এবং ধীরে সরে যায়।
নীতিনির্ধারণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
এই ধারণা দেখায়, শুধু বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দিয়ে প্লাবনের ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো—ভূদৃশ্য কতটা ভেজা এবং পানি সংরক্ষণ ও নির্গমনের প্রাকৃতিক পথ কতটা অক্ষুণ্ণ আছে।
শহুরে জলাভূমি, হ্রদ ও বন্যাপ্রবণ সমতলভূমি ‘অতিরিক্ত জায়গা’ নয়; এগুলো জল সংরক্ষণের অবকাঠামো। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারী বৃষ্টি বাড়তে থাকলে, এই ‘ভূমির স্মৃতি’ বোঝা এবং পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















