ডুরান্ড লাইনকে ঘিরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক নতুন এক সংকটে পৌঁছেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর “ওপেন ওয়ার” ঘোষণা শুধু সীমান্ত উত্তেজনার ইঙ্গিত নয়, বরং দুই দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক সম্পর্কের গভীর ফাটলের প্রতিফলন।
তিন স্তরের ‘রাপচার’
প্রথমত, এটি কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের পর তালিবান কাবুল দখল করলে ধারণা ছিল, দীর্ঘদিনের যোগাযোগের ভিত্তিতে সম্পর্ক মজবুত হবে। কিন্তু সংলাপের একাধিক দফা সত্ত্বেও সম্পর্ক ক্রমেই অবনতি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের ‘এস্টাব্লিশমেন্ট’—সেনাবাহিনী ও আইএসআই—এবং তালিবান নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। নব্বইয়ের দশকে তালিবানের উত্থানে পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নতুন সামরিক নেতৃত্বের অধীনে সেই সম্পর্ক এখন আগের মতো নেই। “ওপেন ওয়ার” ঘোষণা রাওয়ালপিন্ডির অনুমোদন ছাড়া সম্ভব ছিল না।
তৃতীয়ত, দুই দেশের জনগণের মধ্যেও সামাজিক বিভাজন তীব্র হচ্ছে। পাকিস্তানে বসবাসরত আফগান শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ আফগানিস্তান ও তালিবানের তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তানের ভেতরে যদিও বড় সামাজিক বিতর্ক দেখা যায়নি, তবু এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের ঐতিহাসিক সামাজিক বন্ধনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিভেদের উৎস: টিটিপি প্রশ্ন
সম্পর্ক অবনতির অন্যতম কারণ তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)। পাকিস্তানের প্রত্যাশা ছিল, তালিবান ক্ষমতায় এলে টিটিপি দমন করবে। কিন্তু ২০২২-২৫ সময়ে খাইবার পাখতুনখোয়ায় জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে।
কাবুলের অবস্থান—টিটিপি সদস্যরা অতীতে আফগান তালিবানকে আশ্রয় দিয়েছিল; তাই তাদের পুরোপুরি ত্যাগ করা কঠিন। পাশাপাশি ইসলামিক স্টেট-খোরাসান (আইএস-কে) তালিবানের জন্য বড় হুমকি। ফলে টিটিপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে আইএস-কে শক্তিশালী হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ থেকে ‘স্ট্র্যাটেজিক ট্র্যাপ’
পাকিস্তান দীর্ঘদিন আফগানিস্তানকে ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ হিসেবে দেখেছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই কৌশল ভেঙে পড়েছে। কাবুলের অভিযোগ, পাকিস্তান নিজস্ব জঙ্গিবাদের সমস্যাকে বহির্মুখী করে তুলতে আফগানিস্তান ও ভারতের দিকে আঙুল তোলে।
এতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও সংঘাতপ্রবণ হয়ে উঠছে।
অসম শক্তির সমীকরণ
সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তিতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে বড় বৈষম্য রয়েছে। পাকিস্তানের বিমানবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা তালিবানের তুলনায় অনেক বেশি। তালিবানের নেই বিমান বা নৌবাহিনী।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও আফগানিস্তান স্থলবেষ্টিত ও করাচি বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। পাকিস্তান সীমান্তপথ বন্ধ করলে আফগান অর্থনীতি চাপে পড়তে পারে।
সামনে কী?
এই অসম সমীকরণে তালিবান সরাসরি ‘ওপেন ওয়ার’-এ জড়ানোর বদলে সীমিত বা পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। টিটিপি নিয়ন্ত্রণে কাবুলের সক্ষমতা ও কৌশলগত হিসাব পাকিস্তানের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
ডুরান্ড লাইনের দুই পাশে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক অবিশ্বাস ও নিরাপত্তা ঝুঁকি মিলিয়ে সম্পর্ক এখন অনিশ্চিত মোড়ে। ভবিষ্যতে এটি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নেবে, নাকি সীমিত উত্তেজনায় আটকে থাকবে—তা নির্ভর করছে দুই দেশের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















