মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ যদি দ্রুত থেমে না যায়, তবে তার ধাক্কা সরাসরি লাগতে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম বাড়বে, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতিতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সংঘাত থেমে যেতে পারে। তখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস উৎপাদন অব্যাহত থাকবে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগবে না এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও কিছুটা কমে যাবে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, পরিস্থিতি এত সহজ নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

সংঘাত দীর্ঘ হলে বাড়বে জ্বালানির দাম
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সংঘাত দীর্ঘ হয় বা তেল ও গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রে হামলা হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে।
সুদের হার বাড়লে বাড়ির ঋণ, গাড়ির ঋণ এবং অন্যান্য ঋণের খরচ বেড়ে যাবে। এতে ভোক্তা ব্যয় ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক মন্দার পথ তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে বিশ্ব এক অত্যন্ত অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাস বলছে, অনেক সময় ছোট একটি সংঘাতই বড় বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
বিশ্বের তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে যাওয়ার এই সরু জলপথ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

যদি এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায় বা বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে এশিয়া ও ইউরোপের বড় বড় অর্থনীতিতে তেলের সরবরাহে বড় সংকট দেখা দিতে পারে।
ইতিহাসে এর আগেও এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। উনিশ শতকের সত্তরের দশকে তেল উৎপাদক দেশগুলোর সংগঠন সরবরাহ কমিয়ে দিলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল। তখন বহু দেশে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সীমিত পরিমাণ জ্বালানি কিনতে হয়েছে।
জ্বালানি নির্ভরতার বাস্তবতা
বিভিন্ন দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকলেও বাস্তবতা হলো বিশ্ব এখনও তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
যদি যুদ্ধের কারণে তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে শুধু জ্বালানিই নয়, সারসহ বিভিন্ন পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের উৎপাদনও কমে যেতে পারে। এতে খাদ্য উৎপাদনের খরচ বাড়বে এবং দরিদ্র অঞ্চলে খাদ্য সংকট আরও বাড়তে পারে।
বাজারে ইতিমধ্যেই প্রভাব
সংঘাতের আশঙ্কায় তেলের দাম এক পর্যায়ে দশ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়। যদিও পরে দাম কিছুটা কমে আসে, তবু বাজারে উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তরলীকৃত গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিলে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
বড় অর্থনীতিগুলোর বাড়তি চাপ
চীন, জাপান, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শিল্পনির্ভর অর্থনীতিগুলো ইতিমধ্যেই বাণিজ্য উত্তেজনা ও শুল্ক বৃদ্ধির চাপ সামলাচ্ছে। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
চীন বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে, কারণ তাদের তেলের একটি বড় অংশ ইরান থেকে আসে। অন্যদিকে ভারত পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সেই সরবরাহও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির নতুন আশঙ্কা
যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু জ্বালানির দামই বাড়বে না, সামরিক ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এতে বিভিন্ন দেশের ঋণ ও বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুদের হার ও মূল্যস্ফীতির ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দীর্ঘ হলে তার অভিঘাত বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে অনুভূত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















