মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রভাবে হঠাৎ করেই শক্তি ফিরে পেতে শুরু করেছে মার্কিন ডলার। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্থান কোনও নিরাপদ আশ্রয়ের কারণে নয়; বরং তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর চাপ বাড়ার ফলেই ডলারের এই পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা উত্তেজনার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিভিন্ন মুদ্রার ওপর। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর মুদ্রা দুর্বল হয়ে পড়ায় ডলার তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা ও তেলের বাজার
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় বেড়ে যায়। প্রথম দিনে তেলের দাম প্রায় দশ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। এর ফলে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হয় এবং তাদের মুদ্রার মান কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় তেলের দাম বাড়লে অন্য অর্থনীতির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই কারণেই ডলারের মূল্য বাড়তে শুরু করেছে।
এশিয়া ও ইউরোপের মুদ্রায় চাপ
তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সবচেয়ে বেশি পড়েছে জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর। জাপান ও চীনের মতো বড় অর্থনীতিও এই চাপের বাইরে নয়।
জাপানের মুদ্রা ইয়েন ডলারের বিপরীতে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কারণ দেশটির জ্বালানি আমদানির বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পথের ওপর নির্ভরশীল।

একইভাবে চীনের মুদ্রা ইউয়ানও চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইউরোপেও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ইউরোপের গ্যাসের দাম এক সময় প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে ইউরোর মানও কমে ডলারের বিপরীতে এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছে যায়।
তেলের দাম বাড়লে কী হয় বিশ্ব অর্থনীতিতে
বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের দামের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম যদি দশ ডলার বাড়ে এবং তা দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্য দশমিক দুই শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
বর্তমানে তেলের দাম কিছুটা বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় সাতাত্তর ডলারের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। এই বৃদ্ধি আপাতত বড় ধরনের ধাক্কা না দিলেও সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

ডলার বাড়ার পেছনে আরেক হিসাব
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, তেলের দাম বাড়লে সাধারণত ডলারও শক্তিশালী হয়। কারণ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে হয়। ফলে তেলের দাম বাড়লে ডলারের চাহিদাও বাড়ে।
অনুমান করা হয়, তেলের দাম প্রতি দশ ডলার বাড়লে ডলারের মান শূন্য দশমিক পাঁচ থেকে এক শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এক ধরনের চক্র তৈরি হতে পারে—তেলের দাম বাড়বে, ডলার শক্তিশালী হবে, আর এতে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে।

সংঘাত কতদিন চলবে, সেটাই মূল প্রশ্ন
বিশ্ববাজার এখন সবচেয়ে বেশি নজর রাখছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। যদি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি শান্ত হয়, তাহলে বাজারের অস্থিরতাও কমতে পারে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেল, মুদ্রা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত ডলারের শক্তি বাড়লেও এর পেছনে রয়েছে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। আর সেই অস্থিরতা কতদিন থাকবে, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চিত্র।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















