০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
পোষা প্রাণীর জন্য ভিডিও এখন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়, স্ক্রিনে মজেছে বিড়াল-কুকুর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: সার-সংকটের শঙ্কায় বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, ক্ষুধার ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোয়ারে ওরাকলের বড় উত্থান, ২০২৭ সালের আগেই আয়ে নতুন রেকর্ডের ইঙ্গিত পিরিয়ড ট্যাক্সের বিরুদ্ধে তরুণ আইনজীবী মাহনূর ওমরের লড়াই, পাকিস্তানে শুরু নতুন জাতীয় বিতর্ক ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য: বিশ্বের বৃহত্তম শেয়ার বাজারে নামতে প্রস্তুত ইলন মাস্কের স্পেসএক্স ক্রিপ্টো দুনিয়ায় দ্রুত উত্থান ‘স্টেবলকয়েন’-এর, ডলার নির্ভর এই মুদ্রা ঘিরে বাড়ছে ঝুঁকি ও সম্ভাবনার বিতর্ক ইরানপন্থী সমাবেশের আশঙ্কা, লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল নিষিদ্ধ করলেন ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমানিয়ায় মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর অনুমোদন হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ; তেল ছাড়তে প্রস্তুত জাপান ও জার্মানি সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন, মুক্তিতে বাধা নেই

পারস্য উপসাগরে প্রায় ৯৩ লাখ ভারতীয়, ভারতের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করা লক্ষ লক্ষ ভারতীয় শ্রমিক ও পেশাজীবীর পাঠানো অর্থ আজ ভারতের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়ে তারা শুধু নিজেদের পরিবারকে সহায়তা করছেন না, বরং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত ও উত্তেজনা এই বিশাল শ্রমবাজার এবং অর্থপ্রবাহের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

পারস্য উপসাগরের সঙ্গে ভারতের গভীর নির্ভরতা

এশিয়ার অনেক দেশের মতো ভারতও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা তেল ও জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে ভারতের ক্ষেত্রে নির্ভরতার আরেকটি বড় দিক হলো এই অঞ্চলে কর্মরত বিপুলসংখ্যক ভারতীয় শ্রমিক ও পেশাজীবী। বহু দশক ধরে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে গিয়ে ব্যবসা, চাকরি ও শ্রমের মাধ্যমে নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছেন এবং একই সঙ্গে ভারতের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রেখে চলেছেন।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের দেশগুলোতেও। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হয়েছে। এমনকি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দুবাইয়ের মতো শহরেও বিমান চলাচল ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

১৯৭০-এর দশকের তেলসমৃদ্ধির পর থেকে এই অঞ্চল ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে এই অঞ্চলে অস্থিরতা দেখা দিলে শুধু তেলের বাজার নয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা এবং বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

উপসাগরে বিপুল ভারতীয় জনসংখ্যা

ভারতের জনসংখ্যা বর্তমানে ১৪০ কোটির বেশি। বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিবাসী শ্রমিক বিদেশে পাঠানো দেশগুলোর মধ্যে ভারত শীর্ষে। প্রায় দেড় কোটি ভারতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাস করেন। ভারত সরকারের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী সেখানে প্রায় ৯৩ লাখ ভারতীয় রয়েছেন। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয়দের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ।

India's 1.4 Billion Population Is an Economic Virtue - Bloomberg

এই সংখ্যা এতটাই বড় যে তা অস্ট্রিয়ার মোট জনসংখ্যার কাছাকাছি। এমনকি অনেক উপসাগরীয় দেশে ভারতীয়দের সংখ্যা স্থানীয় নাগরিকদের চেয়েও বেশি। উদাহরণ হিসেবে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের কথা বলা যায়।

সংঘাতের ঝুঁকি ও উদ্বেগ

বর্তমান সংঘাতের কারণে রাতারাতি লাখো ভারতীয় দেশ ছেড়ে চলে যাবেন—এমন পরিস্থিতি এখনই তৈরি হয়নি। তবে ইরানের পাল্টা হামলায় দক্ষিণ এশিয়ার কিছু শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনাও ইতিমধ্যে ঘটেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে অথবা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সঙ্গে এর সংযোগ কমে যায়, তাহলে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামোতেই বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

ভারত ও উপসাগর অঞ্চলের পারস্পরিক সম্পর্ক

অভিবাসন নীতি গবেষক নম্রতা রাজুর মতে, ভারত ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য থেকে শুরু করে সংস্কৃতি ও ভাষা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দুই অঞ্চলের সমাজ একে অপরকে প্রভাবিত করে।

উপসাগর অঞ্চলে কর্মরত ভারতীয় স্বাস্থ্যখাতের নির্বাহী রেহান খান জানান, সেখানে অনেক আরব নাগরিকও হিন্দুস্তানি ভাষায় কথা বলেন। বলিউড চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে অফিস বা বাড়ির বাইরে ইংরেজি ব্যবহার করার প্রয়োজনও পড়ে না।

Indian diaspora sends home over $100 billion for second year in a row - The  Economic Times

বিদেশে কর্মরত ভারতীয়দের অর্থ পাঠানো

বিদেশে কর্মরত ভারতীয়রা প্রতি বছর প্রায় ১২৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান। বিশ্বে প্রবাসী আয়ের দিক থেকে এটিই সর্বোচ্চ। এই অর্থ ভারতের মুদ্রা রুপির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই আয়ের পরিমাণ এতটাই বড় যে তা যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বার্ষিক পণ্য রপ্তানির প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। একসময় বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা ছিল ভারতের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। এখন সেই জায়গা দখল করেছে প্রবাসী আয়।

গবেষক নম্রতা রাজুর ভাষায়, এই অর্থপ্রবাহ আসলে ভারতের অর্থনীতির একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী রক্তধারা।

উপসাগরে ভারতীয়দের বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি

পারস্য উপসাগরে শুধু শ্রমিক নয়, উচ্চপদস্থ পেশাজীবী ও সফল উদ্যোক্তারাও কাজ করেন। উদাহরণ হিসেবে লুলু গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতার মতো অনেক ভারতীয় উদ্যোক্তার কথা বলা যায়, যাদের ব্যবসা এখন বিলিয়ন ডলারের পরিসরে পৌঁছেছে।

তবে একই অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ নিম্ন আয়ের শ্রমিকও কাজ করেন। নির্মাণ, পরিবহন ও গৃহপরিচর্যার মতো খাতে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Global Payroll Alliance

স্বল্প আয়ে কঠোর পরিশ্রম

নিম্ন আয়ের অনেক ভারতীয় শ্রমিক খুব অল্প আয়ে জীবনযাপন করেন। গবেষকদের মতে, ওমানে অনেক শ্রমিক মাসে প্রায় ৩৯০ থেকে ৫২০ ডলার পর্যন্ত আয় করেন এবং তার মধ্যে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দেশে পাঠিয়ে দেন।

এই অর্থ দিয়ে পরিবারগুলো বাড়ি তৈরি করে, সন্তানদের স্কুল বা কলেজে পড়ায় এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন গড়ে তোলে। দক্ষিণ ভারতের অনেক ছোট শহর ও গ্রাম মূলত উপসাগরে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো অর্থেই উন্নত হয়েছে।

ভারতের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব

ভারত আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল দেশ, বিশেষ করে তেলের ক্ষেত্রে। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

যেহেতু বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যায়, তাই ডলার বা অন্যান্য শক্তিশালী মুদ্রায় আয় করে দেশে অর্থ পাঠানো ভারতীয় প্রবাসীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

India's oil import dependency up at 88.1% in April-December as demand  growth pips domestic output | Business News - The Indian Express

গত বছর বিভিন্ন চাপের কারণে ভারতীয় রুপি প্রায় ৫ শতাংশ মূল্য হারায়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিও একটি কারণ ছিল। পরে ভারত রাশিয়া থেকে কম দামে তেল কেনা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলে সেই শুল্ক কিছুটা শিথিল করা হয়। এর ফলে ভারতকে আবার মূলত পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকেই তেল কিনতে হচ্ছে, যা তুলনামূলকভাবে বেশি দামি।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য ডলার আয়ের প্রয়োজন আরও বেড়ে গেছে। আর সেই অর্থের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে আছেন পারস্য উপসাগরে কাজ করা লক্ষ লক্ষ ভারতীয় প্রবাসী। যদি কোনো কারণে তাদের সেখানে থাকা বা কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে এর প্রভাব পড়বে ভারত এবং উপসাগরীয় দেশ—উভয়ের অর্থনীতিতেই।

 

#পারস্যউপসাগর #ভারতীয়প্রবাসী #প্রবাসীআয় #ভারতেরঅর্থনীতি #মধ্যপ্রাচ্যসংকট

জনপ্রিয় সংবাদ

পোষা প্রাণীর জন্য ভিডিও এখন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়, স্ক্রিনে মজেছে বিড়াল-কুকুর

পারস্য উপসাগরে প্রায় ৯৩ লাখ ভারতীয়, ভারতের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি

০৫:০০:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করা লক্ষ লক্ষ ভারতীয় শ্রমিক ও পেশাজীবীর পাঠানো অর্থ আজ ভারতের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়ে তারা শুধু নিজেদের পরিবারকে সহায়তা করছেন না, বরং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত ও উত্তেজনা এই বিশাল শ্রমবাজার এবং অর্থপ্রবাহের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

পারস্য উপসাগরের সঙ্গে ভারতের গভীর নির্ভরতা

এশিয়ার অনেক দেশের মতো ভারতও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা তেল ও জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে ভারতের ক্ষেত্রে নির্ভরতার আরেকটি বড় দিক হলো এই অঞ্চলে কর্মরত বিপুলসংখ্যক ভারতীয় শ্রমিক ও পেশাজীবী। বহু দশক ধরে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে গিয়ে ব্যবসা, চাকরি ও শ্রমের মাধ্যমে নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছেন এবং একই সঙ্গে ভারতের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রেখে চলেছেন।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের দেশগুলোতেও। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হয়েছে। এমনকি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দুবাইয়ের মতো শহরেও বিমান চলাচল ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

১৯৭০-এর দশকের তেলসমৃদ্ধির পর থেকে এই অঞ্চল ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে এই অঞ্চলে অস্থিরতা দেখা দিলে শুধু তেলের বাজার নয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা এবং বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

উপসাগরে বিপুল ভারতীয় জনসংখ্যা

ভারতের জনসংখ্যা বর্তমানে ১৪০ কোটির বেশি। বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিবাসী শ্রমিক বিদেশে পাঠানো দেশগুলোর মধ্যে ভারত শীর্ষে। প্রায় দেড় কোটি ভারতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাস করেন। ভারত সরকারের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী সেখানে প্রায় ৯৩ লাখ ভারতীয় রয়েছেন। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয়দের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ।

India's 1.4 Billion Population Is an Economic Virtue - Bloomberg

এই সংখ্যা এতটাই বড় যে তা অস্ট্রিয়ার মোট জনসংখ্যার কাছাকাছি। এমনকি অনেক উপসাগরীয় দেশে ভারতীয়দের সংখ্যা স্থানীয় নাগরিকদের চেয়েও বেশি। উদাহরণ হিসেবে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের কথা বলা যায়।

সংঘাতের ঝুঁকি ও উদ্বেগ

বর্তমান সংঘাতের কারণে রাতারাতি লাখো ভারতীয় দেশ ছেড়ে চলে যাবেন—এমন পরিস্থিতি এখনই তৈরি হয়নি। তবে ইরানের পাল্টা হামলায় দক্ষিণ এশিয়ার কিছু শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনাও ইতিমধ্যে ঘটেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে অথবা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সঙ্গে এর সংযোগ কমে যায়, তাহলে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামোতেই বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

ভারত ও উপসাগর অঞ্চলের পারস্পরিক সম্পর্ক

অভিবাসন নীতি গবেষক নম্রতা রাজুর মতে, ভারত ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য থেকে শুরু করে সংস্কৃতি ও ভাষা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দুই অঞ্চলের সমাজ একে অপরকে প্রভাবিত করে।

উপসাগর অঞ্চলে কর্মরত ভারতীয় স্বাস্থ্যখাতের নির্বাহী রেহান খান জানান, সেখানে অনেক আরব নাগরিকও হিন্দুস্তানি ভাষায় কথা বলেন। বলিউড চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে অফিস বা বাড়ির বাইরে ইংরেজি ব্যবহার করার প্রয়োজনও পড়ে না।

Indian diaspora sends home over $100 billion for second year in a row - The  Economic Times

বিদেশে কর্মরত ভারতীয়দের অর্থ পাঠানো

বিদেশে কর্মরত ভারতীয়রা প্রতি বছর প্রায় ১২৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান। বিশ্বে প্রবাসী আয়ের দিক থেকে এটিই সর্বোচ্চ। এই অর্থ ভারতের মুদ্রা রুপির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই আয়ের পরিমাণ এতটাই বড় যে তা যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বার্ষিক পণ্য রপ্তানির প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। একসময় বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা ছিল ভারতের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। এখন সেই জায়গা দখল করেছে প্রবাসী আয়।

গবেষক নম্রতা রাজুর ভাষায়, এই অর্থপ্রবাহ আসলে ভারতের অর্থনীতির একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী রক্তধারা।

উপসাগরে ভারতীয়দের বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি

পারস্য উপসাগরে শুধু শ্রমিক নয়, উচ্চপদস্থ পেশাজীবী ও সফল উদ্যোক্তারাও কাজ করেন। উদাহরণ হিসেবে লুলু গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতার মতো অনেক ভারতীয় উদ্যোক্তার কথা বলা যায়, যাদের ব্যবসা এখন বিলিয়ন ডলারের পরিসরে পৌঁছেছে।

তবে একই অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ নিম্ন আয়ের শ্রমিকও কাজ করেন। নির্মাণ, পরিবহন ও গৃহপরিচর্যার মতো খাতে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Global Payroll Alliance

স্বল্প আয়ে কঠোর পরিশ্রম

নিম্ন আয়ের অনেক ভারতীয় শ্রমিক খুব অল্প আয়ে জীবনযাপন করেন। গবেষকদের মতে, ওমানে অনেক শ্রমিক মাসে প্রায় ৩৯০ থেকে ৫২০ ডলার পর্যন্ত আয় করেন এবং তার মধ্যে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দেশে পাঠিয়ে দেন।

এই অর্থ দিয়ে পরিবারগুলো বাড়ি তৈরি করে, সন্তানদের স্কুল বা কলেজে পড়ায় এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন গড়ে তোলে। দক্ষিণ ভারতের অনেক ছোট শহর ও গ্রাম মূলত উপসাগরে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো অর্থেই উন্নত হয়েছে।

ভারতের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব

ভারত আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল দেশ, বিশেষ করে তেলের ক্ষেত্রে। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

যেহেতু বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যায়, তাই ডলার বা অন্যান্য শক্তিশালী মুদ্রায় আয় করে দেশে অর্থ পাঠানো ভারতীয় প্রবাসীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

India's oil import dependency up at 88.1% in April-December as demand  growth pips domestic output | Business News - The Indian Express

গত বছর বিভিন্ন চাপের কারণে ভারতীয় রুপি প্রায় ৫ শতাংশ মূল্য হারায়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিও একটি কারণ ছিল। পরে ভারত রাশিয়া থেকে কম দামে তেল কেনা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলে সেই শুল্ক কিছুটা শিথিল করা হয়। এর ফলে ভারতকে আবার মূলত পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকেই তেল কিনতে হচ্ছে, যা তুলনামূলকভাবে বেশি দামি।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য ডলার আয়ের প্রয়োজন আরও বেড়ে গেছে। আর সেই অর্থের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে আছেন পারস্য উপসাগরে কাজ করা লক্ষ লক্ষ ভারতীয় প্রবাসী। যদি কোনো কারণে তাদের সেখানে থাকা বা কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে এর প্রভাব পড়বে ভারত এবং উপসাগরীয় দেশ—উভয়ের অর্থনীতিতেই।

 

#পারস্যউপসাগর #ভারতীয়প্রবাসী #প্রবাসীআয় #ভারতেরঅর্থনীতি #মধ্যপ্রাচ্যসংকট