মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাত তীব্র হওয়ায় পারস্য উপসাগর অঞ্চলের বহু আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অঞ্চলের প্রধান বিমান চলাচল কেন্দ্রগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে এশিয়া থেকে ইউরোপে সরাসরি ফ্লাইটের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে এবং বিমান ভাড়াও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউরোপগামী সরাসরি ফ্লাইটে টিকিট সংকট
বর্তমানে বেইজিং থেকে প্যারিসগামী বেশিরভাগ সরাসরি একমুখী ফ্লাইটের ইকোনমি শ্রেণির টিকিট পুরোপুরি বিক্রি হয়ে গেছে। কিছু প্রিমিয়াম ইকোনমি ও বিজনেস শ্রেণির আসন এখনও সীমিতভাবে পাওয়া যাচ্ছে।
চীনের বৃহত্তম অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ট্রিপ ডটকম গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, রবিবারের একটি এয়ার চায়না ফ্লাইটের ইকোনমি শ্রেণির টিকিট আগেই শেষ হয়ে গেছে। একই ফ্লাইটের একমুখী বিজনেস শ্রেণির টিকিটের দাম প্রায় ৭৭ হাজার ইউয়ান।
অন্যদিকে এয়ার ফ্রান্সের একমুখী ইকোনমি টিকিটের দাম বর্তমানে প্রায় ২৬ হাজার ইউয়ান, যা স্বাভাবিক সময়ে ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার ইউয়ানের মধ্যে থাকে। তবে রবিবারের জন্য কোনো ইকোনমি টিকিট আর অবশিষ্ট নেই। সোমবারের ফ্লাইটে কেবল বিজনেস শ্রেণির আসন পাওয়া যাচ্ছে, যার দাম প্রায় ৫১ হাজার ইউয়ান।

সংঘাতের সরাসরি প্রভাব সীমিত
গুয়াংজু ভিত্তিক বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের বিশ্লেষক গুয়ো জিয়া জানান, চীনের আন্তর্জাতিক বিমান রুটের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের অংশ তুলনামূলকভাবে ছোট। চীন থেকে ইউরোপগামী বেশিরভাগ ফ্লাইট সাধারণত মধ্য এশিয়া ও তুরস্ক হয়ে চলাচল করে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ দিয়ে নয়। তাই চলমান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব চীনা বিমান সংস্থাগুলোর ওপর তুলনামূলকভাবে সীমিত।
তবে উপসাগর অঞ্চলের বিঘ্নের কারণে ইউরোপ, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় চীনা বিমান সংস্থাগুলোর প্রতিষ্ঠিত রুটে যাত্রী চাহিদা বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
দুবাইয়ে আটকে পড়েন চীনা তারকা
সংকটের কারণে অনেক যাত্রী বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন চীনা অভিনেত্রী দিলরাবা দিলমুরাত। তিনি প্যারিসে একটি ফ্যাশন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুবাইয়ে আটকে পড়েন। তার সংস্থা জানায়, রোববার দুবাই হয়ে যাত্রাবিরতির সময় তিনি সেখানে আটকে যান এবং মঙ্গলবারের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি।

চীন–ইউরোপ রুটে চীনা বিমান সংস্থার আধিপত্য
বিমান খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইবিএ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীন ও ইউরোপের সরাসরি ফ্লাইটে মোট আসন সক্ষমতার ৭৭ শতাংশই ছিল চীনা বিমান সংস্থাগুলোর দখলে। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৫৫ শতাংশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী বিমান সংস্থাগুলো এশিয়ায় সরাসরি ফ্লাইট কমিয়ে দিয়েছে। কারণ রাশিয়ার আকাশপথ ব্যবহার করতে না পারায় তাদের ফ্লাইট সময় ও খরচ বেড়ে গেছে। এতে সরাসরি রুটে মূল্য নির্ধারণ ও সক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে চীনা বিমান সংস্থাগুলো সুবিধা পাচ্ছে।
একই সঙ্গে ইউরোপীয় বিমান সংস্থাগুলো তাদের বহু ট্রানজিট যাত্রী হারিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান সংস্থাগুলোর কাছে, যারা তুলনামূলক কম ভাড়া দিত।
গালফ অঞ্চলের বিমান সংস্থাগুলোর বড় ক্ষতি
মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনটি প্রধান গালফ বিমান সংস্থা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। এগুলো হলো এমিরেটস, ইতিহাদ এয়ারওয়েজ এবং কাতার এয়ারওয়েজ।

কাতারের আকাশপথ বন্ধ থাকায় দোহা থেকে ও দোহাগামী সব ফ্লাইট বুধবার সকাল পর্যন্ত স্থগিত ছিল। প্রায় ২৬০টি উড়োজাহাজের বহর থাকা এমিরেটস শনিবার দুবাই থেকে সব ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। পরে সোমবার সন্ধ্যায় সীমিত কিছু ফ্লাইট চালু করা হয়।
খাতসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, একসময় বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক বিমান সংস্থাগুলোর একটি এমিরেটস এখন প্রতিদিন কয়েক কোটি ডলার ক্ষতির মুখে পড়ছে।
ইরানের আকাশপথের ওপর নির্ভরতা
দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ছোট রুট হিসেবে ইরানের আকাশপথ ব্যবহার করে আসছিল এই তিন গালফ বিমান সংস্থা।
ভ্যারিফ্লাইটের প্রধান বিশ্লেষক ফান ঝি বলেন, ইউরোপ–এশিয়া রুটে বড় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করা এসব বিমান সংস্থা তাদের দূরপাল্লার ফ্লাইটের জন্য ইরানের আকাশপথের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাই এই অঞ্চলে আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের ওপর সরাসরি বড় ধরনের আঘাত পড়েছে।
বিকল্প রুটে সময় ও খরচ বাড়ছে
দুবাই বিমানবন্দর আবার চালু হলেও ইরানের আকাশপথ বন্ধ থাকলে এমিরেটসকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হবে, ফলে সময় ও পরিচালন ব্যয় দুটোই বাড়বে।
উদাহরণ হিসেবে দুবাই থেকে লন্ডন রুটে আগে উত্তর-পশ্চিম ইরান হয়ে ফ্লাইটে প্রায় সাত ঘণ্টা সময় লাগত। এখন সৌদি আরব ও মিসরের আকাশপথ ঘুরে যেতে হলে সময় লাগবে নয় ঘণ্টারও বেশি। এতে জ্বালানি খরচ প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















