বিশ্ব অর্থবাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেক বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী এখন মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের বিকল্প খুঁজছেন। এই প্রেক্ষাপটে ধীরে ধীরে কৌশলগত বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে চীনের সার্বভৌম ঋণপত্র বা সভরেন বন্ড। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এটিকে প্রকৃত বৈশ্বিক নিরাপদ সম্পদে পরিণত করতে হলে বাজারে আরও বেশি তারল্য এবং ইউয়ানের আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
চীনা সরকারের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতিবিদ সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
সার্বভৌম ঋণের কৌশলগত গুরুত্ব
চীনা সমাজবিজ্ঞান একাডেমির আমেরিকান স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক শু ছিয়ুয়ান তার প্রতিবেদনে বলেন, চীনের সার্বভৌম বন্ড এমন একটি আর্থিক উপায় যা রেনমিনবির সীমিত রূপান্তরযোগ্যতার বাধা কিছুটা এড়িয়ে যেতে পারে।

তার মতে, এই বন্ডগুলোর পেছনে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ঋণমানের সমর্থন রয়েছে এবং এগুলোর বাজারে যথেষ্ট তারল্যও রয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা এমন ঝুঁকি থেকেও কিছুটা মুক্ত থাকেন, যেখানে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরে থাকা সম্পদ—যেমন মার্কিন ট্রেজারি বন্ড—ধারণের কারণে নিষেধাজ্ঞা বা সম্পদ জব্দের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
চীনের নীতিনির্ধারণী মহলে নতুন বিতর্ক
চীনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে—কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন ডলারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওঠানামা থেকে বেইজিং কৌশলগত সুবিধা নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিষয়টি চীনের বার্ষিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বৈঠক “দুই অধিবেশন”-এও আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে। এই বৈঠকে দেশটির সর্বোচ্চ আইনসভা এবং পরামর্শদাতা সংস্থার নেতারা অংশ নেন।
বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কেন বাড়ছে
শু ছিয়ুয়ানের মতে, বর্তমানে অনেক সার্বভৌম তহবিল ও বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের সম্পদ বণ্টন বৈচিত্র্যময় করতে চাইছে। এই কৌশলগত পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে তারা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার উপায় খুঁজছে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ব অর্থবাজারে মোট তারল্য তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও উচ্চমানের নিরাপদ ও তরল সম্পদের ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতিও চীনা সার্বভৌম বন্ডের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
হংকংয়ে বন্ড ইস্যুতে ব্যাপক সাড়া
এই প্রবণতার একটি বড় উদাহরণ দেখা গেছে গত বছরের নভেম্বর মাসে, যখন বেইজিং হংকংয়ে ৪০০ কোটি ডলারের ডলার-মূল্যমানের সার্বভৌম বন্ড ইস্যু করে।
এই বন্ডের চাহিদা এতটাই বেশি ছিল যে এটি প্রায় ৩০ গুণ বেশি সাবস্ক্রাইব হয়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সার্বভৌম তহবিল, ব্যাংক এবং বীমা কোম্পানির অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য, যা মোট বিনিয়োগকারীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
তিন বছরের মেয়াদি বন্ডে কুপন হার ছিল ৩.৬২৫ শতাংশ, যা মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সমান। পাঁচ বছরের বন্ডে সুদের হার ছিল সমমানের মার্কিন বন্ডের তুলনায় মাত্র ০.০২ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন।
মার্কিন ট্রেজারির চ্যালেঞ্জ
বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ডলারের বাড়তি ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতি অনেক বিনিয়োগকারীকে বিকল্প সম্পদের দিকে তাকাতে বাধ্য করছে।
তবে চীনের সামনে এখনো বাধা
তবে শু ছিয়ুয়ানের মতে, চীনের সার্বভৌম বন্ড এখনো পুরোপুরি বৈশ্বিক নিরাপদ সম্পদের বিকল্প হয়ে ওঠেনি।
এই অবস্থান শক্ত করতে হলে বেইজিংকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় বাজারে নিয়মিত ও পূর্বানুমানযোগ্য সময়সূচি অনুযায়ী বন্ড ইস্যু করতে হবে। এতে বাজারের তারল্য আরও বাড়বে।
একই সঙ্গে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দ্বিতীয়িক বাজারে বন্ড কেনাবেচায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইউয়ানের আন্তর্জাতিকীকরণ জরুরি
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে ইউয়ানের আন্তর্জাতিক ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের আর্থিক অবকাঠামো আরও উন্নত করা প্রয়োজন। তবেই ভবিষ্যতে চীনের সার্বভৌম ঋণ প্রকৃত অর্থে মার্কিন ট্রেজারির শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















