মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা বাড়তে থাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা উন তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। বুধবার ডলারের বিপরীতে উনের দর ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়ে ১৫০০ অতিক্রম করে। এর প্রভাবে দেশটির শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের পতন দেখা যায়।
বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধের বিস্তার দেশটির অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর পর ইরান পাল্টা হামলা শুরু করে। উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি সংঘাত লেবাননেও বিস্তার লাভ করে। এই পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি তার জ্বালানির প্রায় সম্পূর্ণটাই আমদানি করে। দক্ষিণ কোরিয়ার মোট তেল আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
![Dólar à vista [chevron_left]brby[chevron_right] fecha em baixa de 0,59%, a r$5,3220 na venda | Reuters](https://www.reuters.com/resizer/v2/MHG23WQZTBOMNJQEQ63C3U42BA.jpg?auth=86d70463298b5736467ad6032cfa684ac4213d9ea1849272359f455e3ce2ce96&width=1920&quality=80)
১৭ বছরের সর্বনিম্নে উন
এই অস্থিরতার মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা উন একসময় ডলারের বিপরীতে ১৫০০ অতিক্রম করে ১৫০৫.৮ পর্যন্ত নেমে যায়, যা ২০০৯ সালের মার্চের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান। পরে লেনদেন শেষ হওয়ার সময় উনের দর দাঁড়ায় ১৪৮৫.৭, যা দিনের হিসেবে প্রায় ৩.১ শতাংশ পতন।
পরদিন বুধবার আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী ০২:২৬ জিএমটি-তে উনের দর সামান্য ঘুরে দাঁড়িয়ে ১৪৮১.৫ এ অবস্থান করছিল, যা আগের দিনের তুলনায় ০.৩ শতাংশ বেশি।
বিএনওয়াই মেলনের অর্থনীতিবিদেরা এক বিশ্লেষণে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহের ওপর দেশটির নির্ভরতা।
শেয়ারবাজারে বড় ধস
মুদ্রার পতনের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারসূচক কোসপি তীব্রভাবে পড়ে যায়। বুধবার সূচকটি ৮ শতাংশের বেশি নেমে গেলে বাজারে সার্কিট ব্রেকার কার্যকর করতে হয়, যা ২০২৪ সালের আগস্টের পর প্রথম ঘটনা।

এর আগেই ওইদিনের লেনদেন চলাকালে দ্বিতীয় দিনের মতো ‘সাইডকার’ নামে পরিচিত একটি সাময়িক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা হয়।
গত দুই দিনে বাজার থেকে প্রায় ৫৬২.৪ ট্রিলিয়ন উন বা প্রায় ৩৭৯.৯৭ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বাজারমূল্য হারিয়ে গেছে। মঙ্গলবারই কোসপি সূচক ৭.২৪ শতাংশ পড়ে যায়, যা ২০২৪ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে বড় দৈনিক পতন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি ও বাজারের চাপ
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় আকারে শেয়ার বিক্রির কারণেই এই চাপ আরও বেড়েছে। কিওম সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক লি সাং-হুন বলেন, শেয়ার বিক্রি বাড়ার ফলে মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে, আবার বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতার কারণে মুদ্রা দুর্বল হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ আরও বেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে এক ধরনের চক্র তৈরি হয়েছে।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেও দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর রি চ্যাং-ইয়ং বলেছিলেন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য উন্নত হওয়ায় উন শক্তিশালী হচ্ছিল। তখন মুদ্রাটি ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবরের পর সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে গিয়ে ১৪১৯.৪ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্ক অবস্থান
তবে নতুন এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেও যদি মুদ্রার বিনিময় হার বা বন্ডের সুদের হার দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে অতিরিক্ত বিচ্যুত হয়, তাহলে তারা বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
ব্যাংক অব কোরিয়া আরও জানিয়েছে, বাজারে আতঙ্ক বা দলগত আচরণের কারণে অস্বাভাবিক ওঠানামা হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাজারে ডলার কেনার প্রবণতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এক মুদ্রা ব্যবসায়ী। তার মতে, গত মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বড় আকারে শেয়ার বিক্রি করায় এখন বাজারে ডলার কেনার চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকারের স্থিতিশীলতার চেষ্টা
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার গত বছরের শেষ দিক থেকে মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং জানুয়ারিতে এক মন্তব্যে বলেছিলেন, এক থেকে দুই মাসের মধ্যে উনের দর আবার ১৪০০-এর কাছাকাছি শক্তিশালী হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারে অস্থিরতা স্পষ্ট। বুধবার দিনের শুরুতে মোট ৯২৫টি লেনদেন হওয়া শেয়ারের মধ্যে মাত্র ৩০টির দাম বেড়েছে, বিপরীতে ৮৮৯টি শেয়ারের দাম কমেছে।
বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যেও পতন দেখা গেছে। স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের শেয়ার ২.২০ শতাংশ এবং হুন্দাই মোটরের শেয়ার ৩.৫৩ শতাংশ কমে যায়।
এদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৩৭০ বিলিয়ন উন বা প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি করেছেন। এর মাধ্যমে টানা দশম দিনের মতো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি অব্যাহত থাকল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















