যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়তে থাকায় বিশ্ববাজারে সারের সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদন ও পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে সারের বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন এবং কৃষকদের আয়ের ওপরও গুরুতর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পারস্য উপসাগরের ওপর নির্ভরতা
বিশ্বে রপ্তানিকৃত ইউরিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। ইউরিয়া হলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নাইট্রোজেনভিত্তিক সার। পণ্যবাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান স্টোনএক্সের বিশেষজ্ঞ জশ লিনভিলের মতে, বিশ্বের শীর্ষ দশ ইউরিয়া রপ্তানিকারকের মধ্যে কাতার, সৌদি আরব ও ইরান—এই তিনটি দেশ কার্যত হরমুজ প্রণালীর পেছনে আটকে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে পণ্য পরিবহনের প্রধান পথ। এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগতে পারে। লিনভিলের ভাষায়, বছরের এই সময়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনার একটি।
তিনি বলেন, বছরের যেকোনো সময়ে এমন ঘটনা সমস্যা তৈরি করত, কিন্তু এখন উত্তর গোলার্ধে বসন্ত মৌসুমে কৃষি মৌসুম শুরু হওয়ায় এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে।

হঠাৎ বেড়ে গেল ইউরিয়ার দাম
যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ইতিমধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স বাজারে ইউরিয়া বার্জের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। পণ্যবাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আর্গাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি শর্ট টনে ইউরিয়ার দাম ৫০ থেকে ৮০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২০ থেকে ৫৫০ ডলার।
লিনভিলের মতে, এমন দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণত বড় কোনো বৈশ্বিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হলেই ঘটে। তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের এই প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক নয়।
তিনি আরও বলেন, যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনই শুরু না হয়, তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যে কৃষি মৌসুম শুরু হবে, তার জন্য প্রয়োজনীয় সার সময়মতো পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।
গ্যাস ও অ্যামোনিয়া সরবরাহেও প্রভাব
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল শুধু ইউরিয়া নয়, গ্যাস ও অ্যামোনিয়ার বড় উৎসও। এই দুই উপাদান ব্যবহার করে অনেক দেশ সার উৎপাদন করে থাকে।
কমনওয়েলথ ব্যাংকের কৃষি অর্থনীতিবিদ ডেনিস ভোজনেসেনস্কি বলেন, এই সরবরাহ ব্যাহত হলে শুধু সরাসরি সার নয়, অন্যান্য দেশের সার উৎপাদনের খরচও বেড়ে যাবে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে সারের দাম আরও বাড়তে পারে।

কৃষকদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কৃষকদের জন্য ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের চেয়েও কঠিন হতে পারে। তখন সার দাম বাড়লেও একই সঙ্গে শস্যের দামও বেড়েছিল, কারণ ইউক্রেন বিশ্ববাজারে বড় শস্য রপ্তানিকারক।
কিন্তু ইরান গমের বড় রপ্তানিকারক নয়। তাই এই সংঘাত সরাসরি শস্যের দামে বড় বৃদ্ধি ঘটাবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফলে কৃষকদের সামনে এক ধরনের দ্বৈত চাপ তৈরি হবে। তাদের আয় বাড়বে না, কিন্তু উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে লাভের মার্জিন কমে যেতে পারে।
ফসল উৎপাদনেও প্রভাবের আশঙ্কা
যদি দীর্ঘ সময় ধরে সার সরবরাহ সংকট চলতে থাকে, তাহলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম আরও বাড়তে পারে। এতে অনেক কৃষক সার কিনতে না পেরে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তখন কৃষকদের দুই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। হয় কম নাইট্রোজেন লাগে এমন ফসল চাষ করতে হবে, অথবা আগের মতো সার ব্যবহার করতে না পারায় ফলন কমে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার নির্ভরতা ও উদ্বেগ

অস্ট্রেলিয়ায় বপনের মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক সার আগেই কেনা হয়ে গেছে। তবে সেপ্টেম্বর থেকে সিরিয়াল বা খাদ্যশস্যের জমিতে ইউরিয়া প্রয়োগের জন্য কৃষকেরা সাধারণত এই সময়ে নতুন করে সার কেনার পরিকল্পনা করেন।
সরকারি বাণিজ্য তথ্যের ভিত্তিতে আর্গাস জানিয়েছে, ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়া যে ইউরিয়া আমদানি করেছে তার প্রায় ৬৪ শতাংশই এসেছে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ওমান থেকে।
ফার্টিলাইজার অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী স্টিফেন অ্যানেলস বলেন, এই পরিস্থিতি আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে যে অস্ট্রেলিয়া আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর কতটা নির্ভরশীল।
তার মতে, গত দুই দশকে দেশটির নিজস্ব সার উৎপাদন কমে গেছে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলেই অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো দ্রুত ঝুঁকির মুখে পড়ে।
উপসংহার
বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সার। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে, যার প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাজারের ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সামনে আরও বড় সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















