ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রভাব বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনের তেল ও জ্বালানি খাতের শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সপ্তাহের শুরুতে শেয়ারগুলো দ্রুত বাড়লেও বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, এই উত্থান দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেই প্রত্যাশায় চীনের তেল সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ার দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তবে বুধবার সকালেই সেই উত্থানের গতি কমে যায়।
শেয়ারের অস্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ে সতর্কতা
বুধবার শাংহাই ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ খোলার আগে ৫০টিরও বেশি কোম্পানি শেয়ারের ‘অস্বাভাবিক ওঠানামা’ নিয়ে বাধ্যতামূলক ঘোষণা দেয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই তেল, রিফাইনারি, রাসায়নিক ও সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতের সঙ্গে জড়িত।
স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ম অনুযায়ী, টানা তিন কার্যদিবসে কোনো শেয়ারের দাম মোট ২০ শতাংশ বাড়লে বা কমলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে তা প্রকাশ করতে হয়। চীনের মূল ভূখণ্ডের শেয়ারবাজারে দৈনিক মূল্য ওঠানামার সীমা সাধারণত ১০ শতাংশ। গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পরপরই অনেক শেয়ার এই সীমায় পৌঁছে যায়।
বড় তেল কোম্পানিগুলোর ব্যাখ্যা
রাষ্ট্রায়ত্ত তিন বড় তেল কোম্পানির তালিকাভুক্ত ইউনিট—সিনোপেক, পেট্রোচায়না এবং সিএনওওসি—শাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে আলাদা আলাদা বিবৃতি দেয়। তারা জানায়, তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং এমন কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি যা শেয়ারের দামে প্রভাব ফেলতে পারে।
বুধবারের লেনদেন শেষে পেট্রোচায়নার শেয়ার সামান্য বেড়ে ১৩ দশমিক ২৪ ইউয়ানে পৌঁছায়। তবে সিনোপেকের শেয়ার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৭ দশমিক ৪০ ইউয়ানে নেমে আসে এবং সিএনওওসি ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৪২ দশমিক ৮৫ ইউয়ানে দাঁড়ায়। একই দিনে প্রধান শেয়ার সূচক সিএসআই ৩০০ সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৪,৬০২ দশমিক ৬২ পয়েন্টে বন্ধ হয়।
বিশ্লেষকদের সতর্কতা
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও এই উত্থান দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হবে না। ইতিহাসে দেখা গেছে, যুদ্ধ বা সংকটকে কেন্দ্র করে তেলের দামে হঠাৎ বৃদ্ধি হলেও পরিস্থিতি শান্ত হলে বাজার দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল অনুসন্ধানকারী কোম্পানির তুলনায় রিফাইনারি কোম্পানিগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল আয় ধরে রাখতে পারে। কারণ তেলের দামের অস্থিরতার মধ্যেও তাদের আয় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে।

তবে তারা সতর্ক করেছেন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি বিক্রয়মূল্যের চাপের কারণে ভবিষ্যতে কোম্পানিগুলোর মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে ইরান সংকট থেকে চীনের তেল সরবরাহে বড় ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ দেশটির কাছে কৌশলগত তেল মজুত, বাণিজ্যিক মজুত এবং সমুদ্রভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে চীনের একটি বড় উদ্বেগ হলো ইরানি তেলের ওপর নির্ভরতা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ। এই জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়।
ইরান দাবি করেছে যে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করবে।
চীনের কূটনৈতিক অবস্থান
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ ও অবাধ রাখা সব পক্ষের দায়িত্ব। তিনি সব পক্ষকে সামরিক অভিযান বন্ধ করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করার আহ্বান জানান এবং হরমুজ প্রণালীর নৌপথ নিরাপদ রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সংকটের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’রের সঙ্গে ফোনালাপে তিনি জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানান এবং বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করেন।
ওয়াং ই বলেন, সামরিক শক্তির প্রকৃত মূল্য যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং যুদ্ধ প্রতিরোধে।

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
টোকিওতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জাপানে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত গিলাদ কোহেন চীনের অবস্থানের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যদি কোনো দেশ নিশ্চিতভাবে জানে যে এক ঘণ্টার মধ্যে একটি ক্ষেপণাস্ত্র তার ভূখণ্ডে আঘাত হানবে, তাহলে আত্মরক্ষার জন্য শক্তি প্রয়োগ করাই স্বাভাবিক।
তিনি স্বীকার করেন যে এই বিষয়ে চীন ও ইসরায়েলের মতপার্থক্য রয়েছে।
সংঘাতের পেছনে বড় ভূরাজনীতি
কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযান আংশিকভাবে চীনের ওপর চাপ তৈরি করার কৌশলও হতে পারে। কারণ ইরান চীনের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারীদের অন্যতম।
এ প্রসঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রদূত পেইমান সাদাত বলেন, যেকোনো বড় সংকটের পেছনে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাব থাকে।

চীন-ইরান সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন
চীন ও ইরান ২০২১ সালে ২৫ বছরের সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ইরান চীন-নেতৃত্বাধীন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিকস জোটেও যোগ দিয়েছে।
তবে বর্তমান সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে যে এই ধরনের জোট সবসময় সামরিক হামলা ঠেকাতে সক্ষম নয়। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে চীনের কূটনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে।
বিশ্লেষক আলিসিয়া গার্সিয়া হেরেরোর মতে, এই সংঘাত চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক ধাক্কা হতে পারে। কারণ এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক সবসময় তার অংশীদারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
তিনি মনে করেন, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক দক্ষিণে চীনের কূটনৈতিক শক্তি সম্পর্কে নতুনভাবে মূল্যায়ন শুরু হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















