বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে কঠোর সামষ্টিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দ্রুত নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, দৃঢ় নীতিগত পদক্ষেপ ছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আর্থিক খাতে চাপ—সব মিলিয়ে অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় উপস্থাপিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা—দুই মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এই অবস্থায় সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্তই আগামী সময়ের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
প্রবৃদ্ধির গতি কমলেও ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। এর আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে এবং তা পৌঁছেছে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি পুরোপুরি নেই
দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি পুরোপুরি ফিরে আসেনি। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে। খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা কমে যাওয়ায় এই পরিবর্তন এসেছে। তবে একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার তেমন বাড়েনি, ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ এখনো রয়ে গেছে।
বেসরকারি বিনিয়োগে স্পষ্ট দুর্বলতা
অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দাঁড়ায় মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশে, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। এতে বোঝা যায় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় এখনো পুরোপুরি গতি ফিরে আসেনি। একই সময়ে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধিও দ্রুত বাড়ছে।
রাজস্ব আদায়ে উদ্বেগ বাড়ছে
রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতাও অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত নেমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে। একই সময়ে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় বেড়ে ৩৮ শতাংশের বেশি হয়েছে। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে চাপ বাড়ছে
ব্যাংকিং খাতেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। খেলাপি ঋণের হার দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় ১২ শতাংশ, তা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৩৫ শতাংশের বেশি হয়ে যায়। পরে কিছু ঋণ পুনঃতফসিলের ফলে হার কমে প্রায় ৩০ শতাংশে নামলেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাতে শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
রপ্তানি ধীর, প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবাহ
২০২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে একই সময়ে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং প্রায় ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে।
স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য করণীয়
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল পথে রাখতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরানো, রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক করা, ব্যাংকিং খাতের গভীর সংস্কার এবং রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা—এই সব পদক্ষেপ এখন অত্যন্ত জরুরি।
তাদের মতে, ধারাবাহিক নীতিমালা ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ আগামী বছরগুলোতে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















