বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করতে আর্থিক গ্যারান্টি ও সামরিক নিরাপত্তা দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ হয়তো খুব দেরিতে এসেছে। কারণ ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন নিরাপত্তা পরিকল্পনা
মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রপথে বাণিজ্য চালু রাখতে জাহাজ চলাচলের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা ও আর্থিক নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজকে নিরাপত্তা সহায়তাও দিতে পারে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বেড়ে যায় এবং কার্যত এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালায়। এতে কাতারের তরল গ্যাস উৎপাদন এবং সৌদি আরবের একটি বড় তেল শোধনাগার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে হরমুজের আশপাশে কয়েকটি তেলবাহী জাহাজও হামলার মুখে পড়ে, ফলে বীমা কোম্পানি ও জাহাজ মালিকরা ঝুঁকি এড়াতে চলাচল স্থগিত করে।

তেলের দামে হঠাৎ উল্লম্ফন
এই পরিস্থিতির প্রভাব দ্রুতই বৈশ্বিক বাজারে পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৪ ডলারেরও ওপরে উঠে যায়, যা প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এশিয়ার শেয়ারবাজারেও বড় ধাক্কা লাগে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘ সময় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
একই সঙ্গে তেলবাহী জাহাজ ভাড়া করার খরচও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। উপসাগর থেকে এশিয়ায় দুই মিলিয়ন ব্যারেল তেল বহন করতে সক্ষম একটি বড় ট্যাঙ্কার ভাড়া করতে এখন প্রায় তিন কোটি ডলার পর্যন্ত খরচ হচ্ছে, যা বছরের শুরুতে যে দামের ছিল তার প্রায় পাঁচ গুণ।

নিরাপত্তা দিলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কমবে না
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু খরচ কমানো বা আর্থিক নিশ্চয়তা দেওয়া সমস্যার মূল সমাধান নয়। কারণ এখনও জাহাজের ওপর হামলার ঝুঁকি রয়ে গেছে।
মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেলেও ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও দ্রুতগতির নৌকা ব্যবহার করে হামলার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর করা কঠিন। ফলে অনেক জাহাজ কোম্পানি এখনো এই পথে চলাচল নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে।
ইতিহাসে এর আগেও উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিতে বিশেষ সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি তখনকার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকটের আশঙ্কা
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়, যা আশির দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। কাতার এখন বিশ্বের অন্যতম বড় তরল গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ এবং বৈশ্বিক চাহিদার বড় অংশই এই অঞ্চল থেকে সরবরাহ হয়।
এত বিশাল পরিমাণ জ্বালানি ও ট্যাঙ্কার নিরাপদ রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
তবে বড় সমস্যা হলো সময়। এমন একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েক দিন নয়, বরং কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে তেল উৎপাদকরা
হরমুজে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল উৎপাদনও কমতে শুরু করেছে। ইরাক ইতিমধ্যেই প্রতিদিন ১১ লাখ ব্যারেলের বেশি উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে কয়েক দিনের মধ্যে আরও তিন মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সৌদি আরব কিছু তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের একটি বন্দরে পাঠাচ্ছে, কিন্তু সেই বন্দরের রপ্তানি সক্ষমতা সীমিত। ফলে বিপুল পরিমাণ তেল মজুদে রাখতে হচ্ছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও। হরমুজ এড়িয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল সরানো সম্ভব হলেও শেষ পর্যন্ত মজুদ সুবিধার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
এশিয়ার অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে
এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর, কারণ তারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক তেল শোধনাগার বিকল্প উৎস খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে।
চীনের দুটি বড় শোধনাগার ইতিমধ্যেই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ভারতে শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহও সীমিত করতে হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজার সূচক এক সপ্তাহে প্রায় আঠারো শতাংশ পর্যন্ত পড়ে গেছে। কারণ দেশটির বড় শিল্প ও পেট্রোকেমিক্যাল খাত মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন যুদ্ধ কতদিন চলবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, সংঘাত কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এত দীর্ঘ সময় এই চাপ সহ্য করতে পারবে কি না তা নিয়েই এখন বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যদি দ্রুত সমাধান না আসে, তাহলে হরমুজ প্রণালী সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের জ্বালানি ধাক্কা তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















