০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: সার-সংকটের শঙ্কায় বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, ক্ষুধার ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোয়ারে ওরাকলের বড় উত্থান, ২০২৭ সালের আগেই আয়ে নতুন রেকর্ডের ইঙ্গিত পিরিয়ড ট্যাক্সের বিরুদ্ধে তরুণ আইনজীবী মাহনূর ওমরের লড়াই, পাকিস্তানে শুরু নতুন জাতীয় বিতর্ক ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য: বিশ্বের বৃহত্তম শেয়ার বাজারে নামতে প্রস্তুত ইলন মাস্কের স্পেসএক্স ক্রিপ্টো দুনিয়ায় দ্রুত উত্থান ‘স্টেবলকয়েন’-এর, ডলার নির্ভর এই মুদ্রা ঘিরে বাড়ছে ঝুঁকি ও সম্ভাবনার বিতর্ক ইরানপন্থী সমাবেশের আশঙ্কা, লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল নিষিদ্ধ করলেন ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমানিয়ায় মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর অনুমোদন হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ; তেল ছাড়তে প্রস্তুত জাপান ও জার্মানি সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন, মুক্তিতে বাধা নেই থাইল্যান্ডের জাহাজে হরমুজ প্রণালীতে অজ্ঞাত হামলা, নিখোঁজ তিন নাবিক

উন্নয়নের গতি বাড়াতে কী করতে পারে ভারত: চীনের সঙ্গে সত্যিকারের প্রতিযোগিতার নতুন পথ

ভারতের কূটনীতি ও অর্থনীতি এক অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পরও সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের নীতির পরিবর্তন ভারতের কৌশলগত হিসাবকে বদলে দিয়েছে। গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ভারতের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করলে দুই দেশের সম্পর্কের বাস্তবতা নতুনভাবে সামনে আসে।

ভারত শুরুতে মনে করেছিল, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অংশীদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু সেই ধারণা আর বাস্তবসম্মত নয়। যদিও সম্প্রতি দুই দেশ নতুন একটি বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হয়েছে, তবু এখন ভারত ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পথে হাঁটছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন এটিকে “সব চুক্তির জননী” বলে উল্লেখ করেছেন। এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ইউরো রপ্তানি লাভের আশা করছে। এর পাশাপাশি একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি ও আরও নানা সহযোগিতা চুক্তিও হয়েছে। ইউরোপ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তি ভারতের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে।

তবে ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। দেশের বিশাল বাজার তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। বিশ্বমানের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও তেমনভাবে ভারতে আসছে না। ফলে অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো ভারতও মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে ভারতের অর্থনৈতিক কৌশলকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিসরে নতুনভাবে রূপান্তর করতে হবে।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে এশিয়ার বড় বাণিজ্য জোট কমপ্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ এগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা সিপিটিপিপিতে যোগ দেওয়া।

UK signs CPTPP Trade Deal - Civilsdaily

সিপিটিপিপি কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

২০১৮ সালে স্বাক্ষরিত সিপিটিপিপি মূলত ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপের পরবর্তী সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর এই নতুন জোট গড়ে ওঠে। এই চুক্তির লক্ষ্য হলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ক কমানো বা তুলে দেওয়া এবং শ্রম অধিকার, মেধাস্বত্ব ও বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা।

বর্তমানে এই জোটে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চিলি, জাপান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনামসহ মোট ১২টি দেশ রয়েছে। এদের সম্মিলিত অর্থনীতি বিশ্বের প্রায় ১৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। দক্ষিণ কোরিয়া ও কম্বোডিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ এই জোটে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।

ভারতের জন্য এতে যোগ দেওয়া সহজ নয়। এই জোটে প্রবেশ করতে হলে ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। প্রায় পুরো বাজার উন্মুক্ত করা, কৃষি খাতে শুল্ক কমানো এবং কঠোর বাণিজ্য মানদণ্ড মেনে নেওয়া—এসব বিষয় রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর।

তবু এই জোটে যোগ দেওয়ার শক্তিশালী যুক্তিও রয়েছে। এতে ভারতের রপ্তানি বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে এবং দেশটি আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

চীনের উত্থান ও ভারতের ভিন্ন বাস্তবতা

চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এমন এক সময় ঘটেছিল যখন বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং বৈশ্বিকীকরণ দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় যুক্ত হতে সহায়তা করেছিল এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় প্রবেশের পথ তৈরি করেছিল।

কিন্তু গত ১৫ বছরে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ বাড়ছে। ফলে চীনের মতো অনুকূল পরিবেশ ভারতের সামনে নেই।

India's rise is a reality

একই সঙ্গে ভারতের প্রধান ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এখনো শক্তিশালী চীন। হিমালয় সীমান্তে উত্তেজনা থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার—সব ক্ষেত্রেই চীনের উপস্থিতি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ভারতের অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি না হওয়া, কম রপ্তানি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যা উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে আছে।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বা প্রযুক্তি সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই ভারত এখন ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। এদের অনেকেই সিপিটিপিপির সদস্য।

বাণিজ্য জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য লাভ

সিপিটিপিপিতে যোগ দিলে ভারত আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে দ্রুত যুক্ত হতে পারবে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি শিল্প এবং উন্নত উৎপাদন খাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যেখানে বর্তমানে চীনের প্রভাব বেশি।

এই জোটে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া ভারতের অভ্যন্তরীণ সংস্কারও ত্বরান্বিত করতে পারে। আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা অনেক সময় কঠিন সংস্কার বাস্তবায়নে সহায়তা করে।

গবেষণা অনুযায়ী, এই জোটে যোগ দিলে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে বছরে প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তি অবদান রাখতে পারে। বিশেষ করে বস্ত্র, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে সদস্য দেশগুলো প্রথমে ভারতের বিষয়ে দ্বিধায় থাকতে পারে। কারণ আঞ্চলিক আরেকটি বাণিজ্য চুক্তি—আরসিইপির—আলোচনায় ভারত দীর্ঘ সময় অংশ নেওয়ার পর ২০১৯ সালে সরে দাঁড়ায়। এতে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

তারপরও সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হওয়া দেখিয়েছে যে ভারত এখন আগের তুলনায় বেশি বাস্তববাদী এবং কঠিন সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে কোন দেশ আছে?

চ্যালেঞ্জ কোথায়

সিপিটিপিপির শর্তগুলো ভারতের বর্তমান বাণিজ্য চুক্তির তুলনায় অনেক কঠোর। এতে আইন ও পেশাগত সেবা খাত উন্মুক্ত করা, ওষুধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা বাড়ানো এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারি সহায়তা কমানোর মতো বিষয় রয়েছে।

সবচেয়ে বড় বাধা কৃষি খাত। এই জোটে যোগ দিলে গম ও ভুট্টার মতো কৃষিপণ্যে শুল্ক কমাতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী কৃষক গোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

ভারতের আইনি পেশাজীবী গোষ্ঠী, কৃষক সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর বিরোধিতা এই সংস্কারকে কঠিন করে তুলতে পারে।

মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বের হওয়ার পথ

তবু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই বাধাগুলো অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। প্রথম ধাপে ভারত সিপিটিপিপির মানদণ্ড পূরণে কী কী পরিবর্তন প্রয়োজন তা বিশ্লেষণ করতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে সহযোগিতা বাড়িয়ে পর্যবেক্ষক সদস্য হিসেবে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি করতে পারে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কার্বন বাজার ও জলবায়ু অর্থায়নের মতো ক্ষেত্রে প্রাথমিক সহযোগিতা শুরু করা যেতে পারে।

পরবর্তীতে পূর্ণ সদস্যপদ অর্জনের সময় ভারত কিছু খাতে দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের সময়সীমা চাইতে পারে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, ফসল বৈচিত্র্য এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা দেওয়া সম্ভব।

সিপিটিপিপিতে ভারতের অন্তর্ভুক্তি বর্তমান সদস্যদের জন্যও লাভজনক হবে। ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটি চীনের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত।

একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর সম্ভাবনা

Can India Overtake China as World's Growth Engine? It Could Happen by 2028  - Bloomberg

ভারত যদি এই জোটে যোগ দেয়, তবে সিপিটিপিপি একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি থেকে বৃহত্তর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিণত হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সরাসরি এই জোটে যোগ দিতে না পারলেও সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় করতে পারে।

ভারত, ইউরোপ, আসিয়ান দেশ এবং সিপিটিপিপি সদস্যদের সমন্বয়ে ইউরোপ থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক পর্যন্ত একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট গড়ে উঠতে পারে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক সমষ্টি হয়ে উঠতে পারে এবং চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিকল্প তৈরি করতে পারে।

ভারতের সামনে সিদ্ধান্তের মুহূর্ত

ভারত যদি গভীর অর্থনৈতিক সংস্কার না করে, তবে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। অর্থনৈতিক শক্তি ছাড়া সামরিক শক্তি বাড়ানোও সম্ভব নয়।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ভারত যেমন অর্থনৈতিক উদারীকরণ শুরু করেছিল, তেমনি বর্তমান পরিস্থিতিও নতুন সংস্কারের সুযোগ এনে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি এবং চীনের আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি ভারতের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শক্ত রাজনৈতিক অবস্থানে আছেন, যা কঠিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে।

সিপিটিপিপিতে যোগ দিলে ভারত দুইটি বড় লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বের হওয়া। দ্বিতীয়ত, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা।

এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ভারতের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারবে না এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

#ভারত #চীন #বিশ্ববাণিজ্য #অর্থনীতি #সিপিটিপিপি

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: সার-সংকটের শঙ্কায় বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, ক্ষুধার ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ

উন্নয়নের গতি বাড়াতে কী করতে পারে ভারত: চীনের সঙ্গে সত্যিকারের প্রতিযোগিতার নতুন পথ

০৩:০৩:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬

ভারতের কূটনীতি ও অর্থনীতি এক অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পরও সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের নীতির পরিবর্তন ভারতের কৌশলগত হিসাবকে বদলে দিয়েছে। গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ভারতের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করলে দুই দেশের সম্পর্কের বাস্তবতা নতুনভাবে সামনে আসে।

ভারত শুরুতে মনে করেছিল, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অংশীদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু সেই ধারণা আর বাস্তবসম্মত নয়। যদিও সম্প্রতি দুই দেশ নতুন একটি বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হয়েছে, তবু এখন ভারত ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পথে হাঁটছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন এটিকে “সব চুক্তির জননী” বলে উল্লেখ করেছেন। এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ইউরো রপ্তানি লাভের আশা করছে। এর পাশাপাশি একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি ও আরও নানা সহযোগিতা চুক্তিও হয়েছে। ইউরোপ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তি ভারতের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে।

তবে ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। দেশের বিশাল বাজার তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। বিশ্বমানের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও তেমনভাবে ভারতে আসছে না। ফলে অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো ভারতও মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে ভারতের অর্থনৈতিক কৌশলকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিসরে নতুনভাবে রূপান্তর করতে হবে।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে এশিয়ার বড় বাণিজ্য জোট কমপ্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ এগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা সিপিটিপিপিতে যোগ দেওয়া।

UK signs CPTPP Trade Deal - Civilsdaily

সিপিটিপিপি কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

২০১৮ সালে স্বাক্ষরিত সিপিটিপিপি মূলত ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপের পরবর্তী সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর এই নতুন জোট গড়ে ওঠে। এই চুক্তির লক্ষ্য হলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ক কমানো বা তুলে দেওয়া এবং শ্রম অধিকার, মেধাস্বত্ব ও বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা।

বর্তমানে এই জোটে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চিলি, জাপান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনামসহ মোট ১২টি দেশ রয়েছে। এদের সম্মিলিত অর্থনীতি বিশ্বের প্রায় ১৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। দক্ষিণ কোরিয়া ও কম্বোডিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ এই জোটে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।

ভারতের জন্য এতে যোগ দেওয়া সহজ নয়। এই জোটে প্রবেশ করতে হলে ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। প্রায় পুরো বাজার উন্মুক্ত করা, কৃষি খাতে শুল্ক কমানো এবং কঠোর বাণিজ্য মানদণ্ড মেনে নেওয়া—এসব বিষয় রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর।

তবু এই জোটে যোগ দেওয়ার শক্তিশালী যুক্তিও রয়েছে। এতে ভারতের রপ্তানি বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে এবং দেশটি আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

চীনের উত্থান ও ভারতের ভিন্ন বাস্তবতা

চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এমন এক সময় ঘটেছিল যখন বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং বৈশ্বিকীকরণ দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় যুক্ত হতে সহায়তা করেছিল এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় প্রবেশের পথ তৈরি করেছিল।

কিন্তু গত ১৫ বছরে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ বাড়ছে। ফলে চীনের মতো অনুকূল পরিবেশ ভারতের সামনে নেই।

India's rise is a reality

একই সঙ্গে ভারতের প্রধান ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এখনো শক্তিশালী চীন। হিমালয় সীমান্তে উত্তেজনা থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার—সব ক্ষেত্রেই চীনের উপস্থিতি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ভারতের অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি না হওয়া, কম রপ্তানি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যা উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে আছে।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বা প্রযুক্তি সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই ভারত এখন ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। এদের অনেকেই সিপিটিপিপির সদস্য।

বাণিজ্য জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য লাভ

সিপিটিপিপিতে যোগ দিলে ভারত আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে দ্রুত যুক্ত হতে পারবে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি শিল্প এবং উন্নত উৎপাদন খাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যেখানে বর্তমানে চীনের প্রভাব বেশি।

এই জোটে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া ভারতের অভ্যন্তরীণ সংস্কারও ত্বরান্বিত করতে পারে। আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা অনেক সময় কঠিন সংস্কার বাস্তবায়নে সহায়তা করে।

গবেষণা অনুযায়ী, এই জোটে যোগ দিলে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে বছরে প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তি অবদান রাখতে পারে। বিশেষ করে বস্ত্র, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে সদস্য দেশগুলো প্রথমে ভারতের বিষয়ে দ্বিধায় থাকতে পারে। কারণ আঞ্চলিক আরেকটি বাণিজ্য চুক্তি—আরসিইপির—আলোচনায় ভারত দীর্ঘ সময় অংশ নেওয়ার পর ২০১৯ সালে সরে দাঁড়ায়। এতে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

তারপরও সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হওয়া দেখিয়েছে যে ভারত এখন আগের তুলনায় বেশি বাস্তববাদী এবং কঠিন সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে কোন দেশ আছে?

চ্যালেঞ্জ কোথায়

সিপিটিপিপির শর্তগুলো ভারতের বর্তমান বাণিজ্য চুক্তির তুলনায় অনেক কঠোর। এতে আইন ও পেশাগত সেবা খাত উন্মুক্ত করা, ওষুধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা বাড়ানো এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারি সহায়তা কমানোর মতো বিষয় রয়েছে।

সবচেয়ে বড় বাধা কৃষি খাত। এই জোটে যোগ দিলে গম ও ভুট্টার মতো কৃষিপণ্যে শুল্ক কমাতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী কৃষক গোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

ভারতের আইনি পেশাজীবী গোষ্ঠী, কৃষক সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর বিরোধিতা এই সংস্কারকে কঠিন করে তুলতে পারে।

মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বের হওয়ার পথ

তবু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই বাধাগুলো অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। প্রথম ধাপে ভারত সিপিটিপিপির মানদণ্ড পূরণে কী কী পরিবর্তন প্রয়োজন তা বিশ্লেষণ করতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে সহযোগিতা বাড়িয়ে পর্যবেক্ষক সদস্য হিসেবে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি করতে পারে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কার্বন বাজার ও জলবায়ু অর্থায়নের মতো ক্ষেত্রে প্রাথমিক সহযোগিতা শুরু করা যেতে পারে।

পরবর্তীতে পূর্ণ সদস্যপদ অর্জনের সময় ভারত কিছু খাতে দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের সময়সীমা চাইতে পারে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, ফসল বৈচিত্র্য এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা দেওয়া সম্ভব।

সিপিটিপিপিতে ভারতের অন্তর্ভুক্তি বর্তমান সদস্যদের জন্যও লাভজনক হবে। ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটি চীনের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত।

একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর সম্ভাবনা

Can India Overtake China as World's Growth Engine? It Could Happen by 2028  - Bloomberg

ভারত যদি এই জোটে যোগ দেয়, তবে সিপিটিপিপি একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি থেকে বৃহত্তর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিণত হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সরাসরি এই জোটে যোগ দিতে না পারলেও সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় করতে পারে।

ভারত, ইউরোপ, আসিয়ান দেশ এবং সিপিটিপিপি সদস্যদের সমন্বয়ে ইউরোপ থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক পর্যন্ত একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট গড়ে উঠতে পারে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক সমষ্টি হয়ে উঠতে পারে এবং চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিকল্প তৈরি করতে পারে।

ভারতের সামনে সিদ্ধান্তের মুহূর্ত

ভারত যদি গভীর অর্থনৈতিক সংস্কার না করে, তবে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। অর্থনৈতিক শক্তি ছাড়া সামরিক শক্তি বাড়ানোও সম্ভব নয়।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ভারত যেমন অর্থনৈতিক উদারীকরণ শুরু করেছিল, তেমনি বর্তমান পরিস্থিতিও নতুন সংস্কারের সুযোগ এনে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি এবং চীনের আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি ভারতের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শক্ত রাজনৈতিক অবস্থানে আছেন, যা কঠিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে।

সিপিটিপিপিতে যোগ দিলে ভারত দুইটি বড় লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বের হওয়া। দ্বিতীয়ত, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা।

এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ভারতের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারবে না এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

#ভারত #চীন #বিশ্ববাণিজ্য #অর্থনীতি #সিপিটিপিপি