চীন ২০২৬ সালের জন্য প্রতিরক্ষা বাজেট ৭ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। জাতীয় আইনসভায় উপস্থাপিত খসড়া বাজেট প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। চীনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক শক্তি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং প্রতিরক্ষা প্রয়োজন বিবেচনায় এই বৃদ্ধি যুক্তিসঙ্গত ও পরিমিত।
প্রতিরক্ষা বাজেটের ধারাবাহিক বৃদ্ধি
বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি টানা ১১তম বছর যখন চীনের প্রতিরক্ষা বাজেট এক অঙ্কের হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে এই বৃদ্ধির হার ছিল ৭.২ শতাংশ।
২০২৬ সালের খসড়া বাজেট অনুযায়ী, জাতীয় প্রতিরক্ষার জন্য প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বরাদ্দ করা হবে, যা প্রায় ২৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির অংশ, মাথাপিছু প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং প্রতি সামরিক সদস্যের জন্য ব্যয়ের মতো সূচকে এখনও তুলনামূলকভাবে কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে কেন এই বৃদ্ধি জরুরি
গ্লোবাল টাইমসের সঙ্গে কথা বলা চীনা সামরিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, প্রতিরক্ষা বাজেটের এই বৃদ্ধি স্থিতিশীল এবং বাস্তবসম্মত।
সামরিক বিশ্লেষক সং ঝংপিং জানান, অর্থনীতি উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাজেটের একটি অংশ সামরিক সদস্যদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অফিসার ও সৈন্যদের সুবিধা বাড়ানো এবং কাজের পরিবেশ উন্নত করা। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলায় দৈনন্দিন কার্যক্রম ও জনবল সহায়তার খরচও বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। চীনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য মৌলিক অর্থায়ন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
গত এক বছরে চীন তার প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চীনা জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধের বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে একটি বড় সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বহু আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তির প্রথম প্রদর্শন করা হয়।
এর মধ্যে ছিল নতুন নকশার ট্যাংক, বিভিন্ন ধরনের হাইপারসনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ আধিপত্য নিশ্চিতকারী ড্রোন এবং চীনের পারমাণবিক ত্রিমাত্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই ত্রিমাত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য, সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য এবং স্থলভিত্তিক কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র।
এছাড়া ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর চীনের তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী ফুজিয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপল্ট প্রযুক্তিসম্পন্ন এই জাহাজ যুক্ত হওয়ায় চীন আনুষ্ঠানিকভাবে তিনটি বিমানবাহী রণতরীর যুগে প্রবেশ করে।

উন্নত অস্ত্রের সঙ্গে বাড়ছে ব্যয়
সামরিক বিশ্লেষক ওয়াং ইউনফেই বলেন, আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই এর গবেষণা, উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বাড়ছে।
এই কারণে প্রতিরক্ষা ব্যয়ে স্থিতিশীল বৃদ্ধি বজায় রাখা জরুরি, যাতে অস্ত্র উৎপাদনের মান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অব্যাহত রাখা যায়।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বড় কারণ
ওয়াং ইউনফেই আরও বলেন, চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরে কিছু আঞ্চলিক দেশের অবস্থানকে সমর্থন দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে তাইওয়ান অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি তাইওয়ান প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
এছাড়া জাপানের ডানপন্থী সামরিক শক্তির পুনরুত্থানও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বিশ্বব্যাপী সংঘাতের প্রভাব
বিশ্ব পরিস্থিতিও বর্তমানে অস্থির। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং ভেনেজুয়েলা ও ইরান ঘিরে উত্তেজনার মতো ঘটনা বিশ্বকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এই বাস্তবতায় চীনের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে তারা বলছেন, চীন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবেও ভূমিকা রাখতে চায়।

বিশ্বে বাড়ছে সামরিক ব্যয়
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
সংস্থাটির মহাপরিচালক বাস্তিয়ান গিগেরিখ জানান, নতুন বাজেট আইন কার্যকর হলে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। এতে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় আরও বাড়বে।
এমনকি কিছু মার্কিন মহল ২০২৭ সালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার করার দাবিও তুলেছে, যা ২০২৬ সালের জন্য অনুমোদিত ৯০১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক বেশি।

শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের নীতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের স্থিতিশীল বৃদ্ধি একটি বড় শক্তি হিসেবে তার দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। এর মাধ্যমে দেশটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় তার অঙ্গীকার প্রকাশ করছে।
একই সঙ্গে চীন আন্তর্জাতিক অযুদ্ধ সামরিক কার্যক্রমেও সহায়তা বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘পিস আর্ক’ হাসপাতাল জাহাজ পাঠিয়ে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা করা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ।
১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটি শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথ অনুসরণ করছে এবং প্রতিরক্ষা নীতিকে মূলত প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে বিবেচনা করে। দেশটি আধিপত্যবাদ, আগ্রাসন, সম্প্রসারণবাদ এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতার সব ধরনের রূপের বিরোধিতা করে আসছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ‘নতুন যুগে চীনের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, নিরস্ত্রীকরণ ও অস্ত্র বিস্তাররোধ’ শীর্ষক শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, জাতীয় প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমন্বয় বজায় রেখে চীন তার প্রতিরক্ষা ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















