পারিবারিক দায়িত্ব ও মাতৃত্বের কারণে অনেক পেশাজীবী নারী কর্মজীবন থেকে বিরতি নিতে বাধ্য হন। তবে দীর্ঘ বিরতির পরও যেন তারা আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসতে পারেন—এই লক্ষ্য নিয়ে উদ্যোগ নিয়েছে ব্র্যাক। ‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’ নামে একটি বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মজীবন থেকে সরে যাওয়া নারীদের আবার পেশাগত জীবনে ফিরতে সহায়তা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের বিষয়ে জানাতে বৃহস্পতিবার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীর। উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাকের অ্যাসোসিয়েট ক্যারিয়ার অ্যান্ড এমপ্লয়ার ব্র্যান্ড বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার নাজীবুল ইসলাম প্রিম।
নারীদের কাজে ফেরাতে বিশেষ কর্মসূচি
এবারের ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচিতে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি আবেদনকারীর মধ্য থেকে বিভিন্ন ধাপে যাচাই–বাছাই শেষে চূড়ান্তভাবে ২৪ জন নারীকে নির্বাচিত করা হয়েছে। তারা আগামী ছয় মাস ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কাজ করবেন।
নির্বাচিত অংশগ্রহণকারীদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব বিকাশ কর্মশালা এবং মেন্টরিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা ও শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করা হবে, যাতে তারা নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী নতুন কাজ খুঁজে নিতে পারেন।

ক্যারিয়ার বিরতি দুর্বলতার নয়
মৌটুসী কবীর বলেন, ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ একবার বলেছিলেন, “আমি আমার জীবনে কখনো কোনো পরাজিত নারী দেখিনি।” এই বিশ্বাস থেকেই ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচির সূচনা।
তিনি আরও বলেন, কর্মজীবন থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়া কোনো দুর্বলতার পরিচয় নয়। একটি প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার থেকে সরে দাঁড়ানো বড় সিদ্ধান্ত এবং অনেক সময় তা বড় ঝুঁকিও বটে। তবে সেই বিরতি মানেই দক্ষতার অভাব নয়। বরং দক্ষ ও মেধাবী নারীদের আবার কর্মজীবনে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
কেন চাকরি ছাড়েন নারীরা
আবেদনকারীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কর্মজীবন থেকে বিরতি নেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে পারিবারিক দায়িত্ব এবং মাতৃত্বকালীন সময়কে উল্লেখ করেছেন অধিকাংশ নারী।
তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক দায়িত্বের কারণে ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মাতৃত্বকালীন সময়ের কারণে ৩৬ শতাংশ নারী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এছাড়া ব্যক্তিগত কারণ ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ, উচ্চশিক্ষার জন্য ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ, প্রতিকূল কর্মপরিবেশ প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ এবং সামাজিক চাপ ৪ দশমিক ৭ শতাংশ উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

কী অনুপ্রেরণায় ফিরতে চান কর্মজীবনে
বিরতির পর কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসার পেছনে বিভিন্ন অনুপ্রেরণার কথাও জানিয়েছেন আবেদনকারীরা। তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭৬ শতাংশ ক্যারিয়ারে উন্নতির জন্য ফিরে আসতে চান।
এছাড়া আর্থিক স্বাধীনতার লক্ষ্য উল্লেখ করেছেন প্রায় সাড়ে ৫৬ শতাংশ নারী। নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে চান ৬২ দশমিক ২ শতাংশ, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে চান ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পরিবারের জন্য অবদান রাখতে চান ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ।
কর্মজীবন থেকে বিরতির সময়কাল
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশিরভাগ নারী তুলনামূলক স্বল্প সময়ের জন্য কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে ছিলেন। আবেদনকারীদের মধ্যে ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশের বিরতি ছিল এক থেকে দুই বছর। অন্যদিকে ছয় বছরের বেশি সময় কর্মক্ষেত্রের বাইরে ছিলেন ৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী।
অভিজ্ঞতার দিক থেকে দেখা যায়, আবেদনকারীদের ৫৮ শতাংশের অভিজ্ঞতা ছিল তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এবং প্রায় ২৮ দশমিক ৬ শতাংশের অভিজ্ঞতা ছিল সাত বছরেরও বেশি।

অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি
অনুষ্ঠানে একটি প্যানেল আলোচনারও আয়োজন করা হয়। এতে ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এলিজাবেথ মারান্ডী ও সারাহ মাহবুব নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এছাড়া একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি শাহনাজ শারমিনও কর্মসূচি নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
ব্র্যাকের এই ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচি গত বছর থেকে শুরু হয়েছে। প্রথম বছরে প্রায় ১ হাজার ১০০ আবেদনকারীর মধ্য থেকে ১৫ জন নারীকে নির্বাচন করা হয়েছিল।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মজীবন থেকে বিরতি নেওয়া নারীদের নতুন করে পেশাগত জীবনে ফিরে আসার পথ আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করছে ব্র্যাক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















