বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে চাল, ডাল, তেল কিংবা সবজির কথা বেশি শোনা গেলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নতুন করে চাপের মুখে পড়েছেন মাছপ্রেমীরা। দেশের বিভিন্ন বাজারে রুই, কাতলা, পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া থেকে শুরু করে জাতীয় মাছ ইলিশ—প্রায় সব ধরনের মাছের দাম বেড়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য মাছ কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
মৎস্য খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মাছের খাদ্যের দাম বাড়া, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, জ্বালানির ব্যয় এবং মৌসুমি সরবরাহ সংকট—সব মিলিয়ে মাছের বাজারে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়েছে।
কোন মাছ কত দামে বিক্রি হচ্ছে
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন খুচরা বাজারে মাঝারি আকারের চাষের রুই মাছ বর্তমানে প্রতি কেজি ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের নদীর রুইয়ের দাম ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকার মধ্যেও পৌঁছেছে। কাতলা মাছের দামও রুইয়ের কাছাকাছি, অনেক ক্ষেত্রে প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

একসময় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ভরসা হিসেবে পরিচিত পাঙ্গাশ মাছের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাজারভেদে পাঙ্গাশ প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক বছর আগের তুলনায় এ মাছের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও বাজার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তেলাপিয়া মাছের দামও এখন ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। মাছচাষিরা বলছেন, খাদ্য ও ওষুধের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কম দামে মাছ বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইলিশ এখন অনেকের নাগালের বাইরে
সবচেয়ে আলোচিত মূল্যবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে ইলিশের বাজারে। আকারভেদে বর্তমানে ইলিশ প্রতি কেজি ১,৫০০ থেকে ৩,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ অনেক বাজারে ২,৪০০ থেকে ৩,০০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। মাঝারি আকারের ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দামও ১,৪০০ থেকে ২,০০০ টাকার মধ্যে রয়েছে।
বাজারে সরবরাহ বাড়লেও ইলিশের দাম কমছে না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নদীতে মাছ ধরার ব্যয়, বরফ ও পরিবহন খরচ এবং মধ্যবর্তী পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফা দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

কেন বাড়ছে মাছের দাম?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছের খাদ্যের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, ডিজেল, বরফ ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। ফলে মাছ খামার থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ব্যয় যোগ হচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা। উৎপাদক যে দামে মাছ বিক্রি করেন, খুচরা বাজারে সেই মাছের দাম অনেক বেশি হয়ে যায়। বিশেষ করে ইলিশের ক্ষেত্রে জেলে ও ভোক্তার মধ্যকার দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থায় মূল্য অনেক গুণ বেড়ে যায়।
ভোক্তাদের উদ্বেগ
বাজারে গিয়ে অনেক ক্রেতাই এখন মাছের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। যারা আগে সপ্তাহে কয়েকবার মাছ কিনতেন, তারা এখন বিকল্প প্রোটিনের দিকে ঝুঁকছেন। তবে মাংস, ডিম ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দামও বেশি থাকায় ভোক্তারা কার্যত দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন।
বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাসে মাছ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই বাজার স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে। তা না হলে সাধারণ মানুষের পাতে মাছের উপস্থিতি আরও কমে যেতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















