০৩:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
গ্যাস আছে, কিন্তু গ্যাস নেই: বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের আসল হিসাব সবজির দামে নতুন ঝড়: সার সংকট, বিশ্ববাজার ও বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের খাবারের ভবিষ্যৎ জঙ্গিদের হাতে রিমোট নিয়ন্ত্রিত বোমা, সাভার-আশুলিয়ায় পরপর উদ্ধারে পুলিশের উদ্বেগ নেপালে তিব্বতবিষয়ক সম্মেলন বাতিল, চীনের চাপ নিয়ে তীব্র বিতর্ক  ভারত নান্দেডের গুরুদ্বারে সুখবীর বাদলের ওপর হামলা, হাতে সামান্য আঘাত বিরোধীদের ঐক্যে চাপে মোদি সরকার, পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ বিল ঠেকানোর দাবি কংগ্রেসের ভারত খড়গের সভাস্থল ‘শুদ্ধিকরণ’ নিয়ে উত্তাল উত্তরাখণ্ড, বিজেপির বিরুদ্ধে জাতপাতের অভিযোগ মোদির বিদেশনীতি নিয়ে রাহুলের কটাক্ষ, ‘মোদিভক্ত’ হয়ে দেশের লাভ হবে না: খার্গে উত্তরাখণ্ডের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে ধস ও পানির স্রোত, আটকা পড়ার আশঙ্কা ৬ শ্রমিকের তরুণ শক্তির আবেগে সাজছে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস

গ্যাস আছে, কিন্তু গ্যাস নেই: বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের আসল হিসাব

১৫ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের গ্যাস সংকটকে এতদিন অনেকটা সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি হিসেবে দেখা হয়েছে। কোনো গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমেছে, কোনো এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়েছে, কখনো আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে—প্রতিবারই সংকটের ব্যাখ্যা এসেছে আলাদা আলাদা কারণে। কিন্তু এখন যে চিত্রটি সামনে আসছে, তা আরও কঠিন: বাংলাদেশের গ্যাস সংকট আসলে একটি কাঠামোগত সমস্যা, যার ওপর একের পর এক বৈশ্বিক ধাক্কা এসে চাপ বাড়াচ্ছে।

১৩ আগস্টের পরিস্থিতিতে গ্যাসের ঘাটতি এতটাই তীব্র হয়েছে যে সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। দোকান, বাজার ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে জাতীয় গ্রিডে পিক আওয়ারে কয়েকশ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে।

এটি কেবল বিদ্যুৎ বা রান্নার গ্যাসের সমস্যা নয়। গ্যাসের চাপ কমলে শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে, সার কারখানা ঝুঁকিতে পড়ে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে রপ্তানি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের ব্যয়ের ওপর।

ঘাটতির আসল অঙ্ক

জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশের গ্যাসের মজুদ শেষ হয়ে যাবে ৯ বছরের মধ্যে - BBC  News বাংলা

বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা আনুমানিক ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ জাতীয় গ্রিডে গড় সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে বোঝা যায় বর্তমান সংকট কোনো একদিনের দুর্ঘটনা নয়। একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়া সংকটকে তীব্র করতে পারে, কিন্তু এমন বড় ঘাটতি তৈরি করতে হলে তার পেছনে দীর্ঘদিনের উৎপাদন পতন ও চাহিদা বৃদ্ধির সমীকরণ থাকতে হয়।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সেই বাস্তবতাই দেখায়। এনার্জি ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ২০২৩ সালে ২১.১ বিলিয়ন ঘনমিটারে নেমে আসে। পরবর্তী সংস্করণের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে তা আরও কমে ১৯.৭ বিলিয়ন ঘনমিটারে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে উৎপাদন আরও কমেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব গ্যাসভিত্তি ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে।

অন্যদিকে চাহিদা থামেনি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা আনুমানিক ৪ শতাংশ বেড়েছে, যার প্রধান চালক ছিল শিল্প খাত।

অর্থাৎ সমস্যাটি দুই দিক থেকে তৈরি হচ্ছে—দেশীয় উৎপাদন কমছে, আর অর্থনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে।

এলএনজি এখন নিরাপত্তা, আবার ঝুঁকিও

দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থার ওপর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির গুরুত্ব দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমাণ এলএনজি আমদানি করেছে। আন্তর্জাতিক গ্যাস ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্য রেকর্ড ৪৩৭ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছিল; বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার তাই ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু আমদানিনির্ভরতা একটি নতুন দুর্বলতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এলএনজি সরবরাহকারী কাতার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৭ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করেছিল, যার মধ্যে প্রায় ৪.১৫ মিলিয়ন টন এসেছিল কাতার থেকে। চলতি বছরে যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির পরিবহনঝুঁকির কারণে কাতার থেকে বাংলাদেশের নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

এলএনজি আমদানি আগামী দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও দুর্বল করবে

এর অর্থ হলো বাংলাদেশ এখন শুধু গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়; তাকে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, এলএনজি বাজারের দাম, বৈদেশিক মুদ্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান তাদের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পেয়েছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই গ্যাসভিত্তিক ছিল। ফলে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন মানেই শুধু শিল্পে গ্যাসের চাপ কমা নয়; বিদ্যুৎ উৎপাদনও সরাসরি ঝুঁকিতে পড়া।

একটি টার্মিনালের আগুন কেন এত বড় সংকট তৈরি করল

২১ জুলাই মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনের পর প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ৬ আগস্ট একটি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট আংশিকভাবে চালু হলে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে ফিরে আসে। কিন্তু টার্মিনালটির স্বাভাবিক সক্ষমতা প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।

এই ঘটনার অর্থনৈতিক শিক্ষা আরও বড়। যখন একটি দেশের মোট গ্যাস ব্যবস্থায় আমদানিকৃত এলএনজির অংশ উল্লেখযোগ্য হয়ে যায় এবং আমদানির জন্য সীমিত সংখ্যক টার্মিনালের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়, তখন একটি অবকাঠামোগত দুর্ঘটনাও জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের সমস্যা শুধু “গ্যাস কম” নয়। সমস্যা হলো গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা কম।

শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা যায় শিল্পে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব বলছে, গত বছর বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধির প্রধান চালক ছিল শিল্প খাত। অথচ এই একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

এর ফলে একটি দ্বৈত চাপ তৈরি হচ্ছে। শিল্পকে গ্যাস দিতে গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি কমতে পারে; বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গ্যাস দিলে শিল্পে চাপ পড়তে পারে। আর যখন গ্যাস কমে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে, তখন শিল্পকারখানা দ্বিতীয় দফা ক্ষতির মুখে পড়ে—প্রথমে গ্যাসের কারণে, পরে বিদ্যুতের কারণে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে কারখানার উৎপাদন সময় কমে, নিজস্ব জেনারেটরের ব্যবহার বাড়ে, জ্বালানি ব্যয় বাড়ে এবং সরবরাহের সময়সূচি অনিশ্চিত হয়। রপ্তানিমুখী বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব আরও গুরুতর, কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দেরি ও অনিয়মিত সরবরাহের ঝুঁকি দীর্ঘদিন বহন করতে চান না।

শিল্পের গ্যাস দিয়ে চলছে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন, দিশেহারা কারখানা মালিকরা

সংকটের আরেকটি মুখ বৈদেশিক মুদ্রা

এলএনজি কেনা মানে শুধু গ্যাস কেনা নয়; এর জন্য ডলার দরকার। বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদনের চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দাম ও সরবরাহের ঝুঁকি বাড়িয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে।

এখানেই গ্যাস সংকটটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।

উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে হলে আমদানি বিল বাড়ে। ডলারের চাহিদা বাড়ে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত এই ব্যয়ের কোনো না কোনো অংশ বিদ্যুতের দাম, শিল্পপণ্যের দাম বা সরকারি অর্থের ওপর এসে পড়ে।

আইএমএফও বলেছে, দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি ও জ্বালানি-সংক্রান্ত অন্যান্য সীমাবদ্ধতা বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের ব্যয় বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ বাড়িয়েছে।

পুরনো বিনিয়োগের ঘাটতির মাশুল

বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে, কিন্তু পুরো সংকটের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারকে দায়ী করলে বাস্তব সমস্যার অর্ধেকই দেখা হবে।

বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের গবেষণা অগ্রাধিকারের তালিকাতেই গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার ক্ষতি, লিকেজ শনাক্তকরণ এবং শীতকালে নিম্নচাপ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর অর্থ, সরবরাহের সমস্যা শুধু উৎপাদন পর্যায়ে নয়; সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও নতুন তৎপরতার প্রয়োজন স্পষ্ট। সরকার ২০২৬ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ড চালু করেছে—যা দেখায় দেশের অভ্যন্তরীণ ও সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধান আবারও জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে।

কিন্তু নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার থেকে উৎপাদনে যেতে সময় লাগে। তাই আজকের সংকটের সমাধান হিসেবে আগামী দিনের অনুসন্ধান যথেষ্ট নয়।

সামনে কী?

এক সংকটে দুই আঘাত: ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প, দুর্ভোগে গ্রাহক | অর্থনীতি | Citizens  Voice

বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি সময়সীমা আলাদা করে দেখা দরকার।

স্বল্পমেয়াদে লক্ষ্য হবে এলএনজি সরবরাহ স্থিতিশীল করা, টার্মিনালগুলোর নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ ও শিল্পের মধ্যে গ্যাস বণ্টনে অগ্রাধিকার ঠিক করা। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কেনা যেতে পারে, কিন্তু তাতে দাম ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি বাড়বে। আইইএও দেখিয়েছে, উচ্চ স্পট এলএনজি মূল্যের কারণে এশিয়ার বাজারগুলোতে গ্যাসের ব্যবহার কমে এবং বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়ে।

মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের প্রয়োজন নতুন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন পুনর্মূল্যায়ন, পাইপলাইন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং এলএনজি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ।

দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আরও মৌলিক: বাংলাদেশ কি আবার একটি গ্যাসকেন্দ্রিক জ্বালানি কাঠামো বানাবে, নাকি গ্যাসকে একটি সেতু-জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে সৌর, বায়ু, দক্ষতা বৃদ্ধি ও অন্যান্য বিকল্প উৎসের দিকে যাবে?

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে যাওয়া এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ মাঝারি মেয়াদেও এলএনজির ওপর নির্ভরশীল থাকবে।

এটাই বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের সবচেয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা।

এটি এমন একটি সংকট নয়, যা একটি টার্মিনাল মেরামত হলেই শেষ হবে। একটি টার্মিনাল চালু হলে কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ফিরে আসতে পারে; কিন্তু দেশের দৈনিক চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ব্যবধান, সেটি থেকে যাবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তাই আসল প্রশ্ন “গ্যাস কোথায়?” নয়। আসল প্রশ্ন হলো—দেশের চাহিদা কত দ্রুত বাড়ছে, নিজস্ব উৎপাদন কত দ্রুত কমছে, আমদানি কতটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে এবং সেই আমদানির ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি আর কতদিন নিরাপদ থাকবে।

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা সেখানেই: বাংলাদেশের গ্যাসের সমস্যা এখন শুধু জ্বালানির সমস্যা নয়। এটি উৎপাদন, বিদ্যুৎ, রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা, সরকারি ভর্তুকি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত একটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্যাস আছে, কিন্তু গ্যাস নেই: বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের আসল হিসাব

গ্যাস আছে, কিন্তু গ্যাস নেই: বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের আসল হিসাব

০৩:০৮:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

১৫ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের গ্যাস সংকটকে এতদিন অনেকটা সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি হিসেবে দেখা হয়েছে। কোনো গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমেছে, কোনো এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়েছে, কখনো আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে—প্রতিবারই সংকটের ব্যাখ্যা এসেছে আলাদা আলাদা কারণে। কিন্তু এখন যে চিত্রটি সামনে আসছে, তা আরও কঠিন: বাংলাদেশের গ্যাস সংকট আসলে একটি কাঠামোগত সমস্যা, যার ওপর একের পর এক বৈশ্বিক ধাক্কা এসে চাপ বাড়াচ্ছে।

১৩ আগস্টের পরিস্থিতিতে গ্যাসের ঘাটতি এতটাই তীব্র হয়েছে যে সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। দোকান, বাজার ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে জাতীয় গ্রিডে পিক আওয়ারে কয়েকশ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে।

এটি কেবল বিদ্যুৎ বা রান্নার গ্যাসের সমস্যা নয়। গ্যাসের চাপ কমলে শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে, সার কারখানা ঝুঁকিতে পড়ে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে রপ্তানি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের ব্যয়ের ওপর।

ঘাটতির আসল অঙ্ক

জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশের গ্যাসের মজুদ শেষ হয়ে যাবে ৯ বছরের মধ্যে - BBC  News বাংলা

বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা আনুমানিক ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ জাতীয় গ্রিডে গড় সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে বোঝা যায় বর্তমান সংকট কোনো একদিনের দুর্ঘটনা নয়। একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়া সংকটকে তীব্র করতে পারে, কিন্তু এমন বড় ঘাটতি তৈরি করতে হলে তার পেছনে দীর্ঘদিনের উৎপাদন পতন ও চাহিদা বৃদ্ধির সমীকরণ থাকতে হয়।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সেই বাস্তবতাই দেখায়। এনার্জি ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ২০২৩ সালে ২১.১ বিলিয়ন ঘনমিটারে নেমে আসে। পরবর্তী সংস্করণের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে তা আরও কমে ১৯.৭ বিলিয়ন ঘনমিটারে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে উৎপাদন আরও কমেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব গ্যাসভিত্তি ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে।

অন্যদিকে চাহিদা থামেনি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা আনুমানিক ৪ শতাংশ বেড়েছে, যার প্রধান চালক ছিল শিল্প খাত।

অর্থাৎ সমস্যাটি দুই দিক থেকে তৈরি হচ্ছে—দেশীয় উৎপাদন কমছে, আর অর্থনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে।

এলএনজি এখন নিরাপত্তা, আবার ঝুঁকিও

দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থার ওপর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির গুরুত্ব দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমাণ এলএনজি আমদানি করেছে। আন্তর্জাতিক গ্যাস ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্য রেকর্ড ৪৩৭ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছিল; বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার তাই ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু আমদানিনির্ভরতা একটি নতুন দুর্বলতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এলএনজি সরবরাহকারী কাতার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৭ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করেছিল, যার মধ্যে প্রায় ৪.১৫ মিলিয়ন টন এসেছিল কাতার থেকে। চলতি বছরে যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির পরিবহনঝুঁকির কারণে কাতার থেকে বাংলাদেশের নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

এলএনজি আমদানি আগামী দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও দুর্বল করবে

এর অর্থ হলো বাংলাদেশ এখন শুধু গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়; তাকে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, এলএনজি বাজারের দাম, বৈদেশিক মুদ্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান তাদের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পেয়েছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই গ্যাসভিত্তিক ছিল। ফলে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন মানেই শুধু শিল্পে গ্যাসের চাপ কমা নয়; বিদ্যুৎ উৎপাদনও সরাসরি ঝুঁকিতে পড়া।

একটি টার্মিনালের আগুন কেন এত বড় সংকট তৈরি করল

২১ জুলাই মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনের পর প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ৬ আগস্ট একটি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট আংশিকভাবে চালু হলে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে ফিরে আসে। কিন্তু টার্মিনালটির স্বাভাবিক সক্ষমতা প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।

এই ঘটনার অর্থনৈতিক শিক্ষা আরও বড়। যখন একটি দেশের মোট গ্যাস ব্যবস্থায় আমদানিকৃত এলএনজির অংশ উল্লেখযোগ্য হয়ে যায় এবং আমদানির জন্য সীমিত সংখ্যক টার্মিনালের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়, তখন একটি অবকাঠামোগত দুর্ঘটনাও জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের সমস্যা শুধু “গ্যাস কম” নয়। সমস্যা হলো গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা কম।

শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা যায় শিল্পে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব বলছে, গত বছর বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধির প্রধান চালক ছিল শিল্প খাত। অথচ এই একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

এর ফলে একটি দ্বৈত চাপ তৈরি হচ্ছে। শিল্পকে গ্যাস দিতে গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি কমতে পারে; বিদ্যুৎকেন্দ্রকে গ্যাস দিলে শিল্পে চাপ পড়তে পারে। আর যখন গ্যাস কমে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে, তখন শিল্পকারখানা দ্বিতীয় দফা ক্ষতির মুখে পড়ে—প্রথমে গ্যাসের কারণে, পরে বিদ্যুতের কারণে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে কারখানার উৎপাদন সময় কমে, নিজস্ব জেনারেটরের ব্যবহার বাড়ে, জ্বালানি ব্যয় বাড়ে এবং সরবরাহের সময়সূচি অনিশ্চিত হয়। রপ্তানিমুখী বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব আরও গুরুতর, কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দেরি ও অনিয়মিত সরবরাহের ঝুঁকি দীর্ঘদিন বহন করতে চান না।

শিল্পের গ্যাস দিয়ে চলছে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন, দিশেহারা কারখানা মালিকরা

সংকটের আরেকটি মুখ বৈদেশিক মুদ্রা

এলএনজি কেনা মানে শুধু গ্যাস কেনা নয়; এর জন্য ডলার দরকার। বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদনের চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দাম ও সরবরাহের ঝুঁকি বাড়িয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে।

এখানেই গ্যাস সংকটটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।

উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে হলে আমদানি বিল বাড়ে। ডলারের চাহিদা বাড়ে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত এই ব্যয়ের কোনো না কোনো অংশ বিদ্যুতের দাম, শিল্পপণ্যের দাম বা সরকারি অর্থের ওপর এসে পড়ে।

আইএমএফও বলেছে, দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি ও জ্বালানি-সংক্রান্ত অন্যান্য সীমাবদ্ধতা বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের ব্যয় বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ বাড়িয়েছে।

পুরনো বিনিয়োগের ঘাটতির মাশুল

বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে, কিন্তু পুরো সংকটের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারকে দায়ী করলে বাস্তব সমস্যার অর্ধেকই দেখা হবে।

বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের গবেষণা অগ্রাধিকারের তালিকাতেই গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার ক্ষতি, লিকেজ শনাক্তকরণ এবং শীতকালে নিম্নচাপ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর অর্থ, সরবরাহের সমস্যা শুধু উৎপাদন পর্যায়ে নয়; সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও নতুন তৎপরতার প্রয়োজন স্পষ্ট। সরকার ২০২৬ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ড চালু করেছে—যা দেখায় দেশের অভ্যন্তরীণ ও সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধান আবারও জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে।

কিন্তু নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার থেকে উৎপাদনে যেতে সময় লাগে। তাই আজকের সংকটের সমাধান হিসেবে আগামী দিনের অনুসন্ধান যথেষ্ট নয়।

সামনে কী?

এক সংকটে দুই আঘাত: ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প, দুর্ভোগে গ্রাহক | অর্থনীতি | Citizens  Voice

বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি সময়সীমা আলাদা করে দেখা দরকার।

স্বল্পমেয়াদে লক্ষ্য হবে এলএনজি সরবরাহ স্থিতিশীল করা, টার্মিনালগুলোর নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ ও শিল্পের মধ্যে গ্যাস বণ্টনে অগ্রাধিকার ঠিক করা। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কেনা যেতে পারে, কিন্তু তাতে দাম ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি বাড়বে। আইইএও দেখিয়েছে, উচ্চ স্পট এলএনজি মূল্যের কারণে এশিয়ার বাজারগুলোতে গ্যাসের ব্যবহার কমে এবং বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়ে।

মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের প্রয়োজন নতুন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন পুনর্মূল্যায়ন, পাইপলাইন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং এলএনজি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ।

দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আরও মৌলিক: বাংলাদেশ কি আবার একটি গ্যাসকেন্দ্রিক জ্বালানি কাঠামো বানাবে, নাকি গ্যাসকে একটি সেতু-জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে সৌর, বায়ু, দক্ষতা বৃদ্ধি ও অন্যান্য বিকল্প উৎসের দিকে যাবে?

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে যাওয়া এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ মাঝারি মেয়াদেও এলএনজির ওপর নির্ভরশীল থাকবে।

এটাই বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের সবচেয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা।

এটি এমন একটি সংকট নয়, যা একটি টার্মিনাল মেরামত হলেই শেষ হবে। একটি টার্মিনাল চালু হলে কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ফিরে আসতে পারে; কিন্তু দেশের দৈনিক চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ব্যবধান, সেটি থেকে যাবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তাই আসল প্রশ্ন “গ্যাস কোথায়?” নয়। আসল প্রশ্ন হলো—দেশের চাহিদা কত দ্রুত বাড়ছে, নিজস্ব উৎপাদন কত দ্রুত কমছে, আমদানি কতটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে এবং সেই আমদানির ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি আর কতদিন নিরাপদ থাকবে।

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা সেখানেই: বাংলাদেশের গ্যাসের সমস্যা এখন শুধু জ্বালানির সমস্যা নয়। এটি উৎপাদন, বিদ্যুৎ, রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা, সরকারি ভর্তুকি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত একটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি।