নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে চলতি মাসে অনুষ্ঠেয় তিব্বতবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়ায় দেশটির ওপর চীনের চাপের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২৩ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় সম্মেলনটিতে প্রায় ৭০০ গবেষক ও শিক্ষাবিদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তাঁদের মধ্যে চীনের কয়েকজন গবেষকও ছিলেন।
সম্মেলন বাতিলের নেপথ্যে কী
সম্মেলনটির আয়োজক আন্তর্জাতিক তিব্বতবিষয়ক গবেষণা সমিতি জানিয়েছে, নেপাল সরকারের অনুরোধেই অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। তবে নেপাল সরকার এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। আয়োজকদের দাবি, একটি সম্পূর্ণ শিক্ষাবিষয়ক আয়োজনে এ ধরনের হস্তক্ষেপ অপ্রত্যাশিত ও অনভিপ্রেত।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমালয় এশীয় গবেষণা কেন্দ্র, যা সম্মেলনের স্থানীয় আয়োজক ছিল, জানিয়েছে, সরকারের নির্দেশেই অনুষ্ঠানটি বাতিল করতে হয়েছে। পরে সম্মেলনটি অনলাইনে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চীনের সঙ্গে আলোচনার সূত্র
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে নেপালে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ঝাং মাওমিং দেশটির পররাষ্ট্রসচিব অমৃত বাহাদুর রাইয়ের সঙ্গে বৈঠকে সম্মেলনটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তবে চীন সরাসরি সম্মেলন বাতিলের দাবি জানিয়েছিল—এমন কোনো তথ্য ওই কর্মকর্তা দেননি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনাটি ছিল সীমিত পরিসরের। একই সময়ে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনানুষ্ঠানিকভাবে চীনা দূতের কাছে সম্মেলন নিয়ে বেইজিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট উদ্বেগ আছে কি না, তা জানতে চেয়েছিল।
তবে কয়েক সপ্তাহ পরই সম্মেলনটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে নেপাল নিজেই সম্ভাব্য কূটনৈতিক জটিলতা এড়াতে চীনের অবস্থান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
তিব্বত ইস্যুতে নেপালের স্পর্শকাতর অবস্থান
নেপালে প্রায় ১২ হাজার তিব্বতি শরণার্থী বসবাস করেন। আবার ভারত ও তিব্বতের মধ্যবর্তী পথ হিসেবেও অনেকে নেপাল ব্যবহার করেন। ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন দালাই লামা।
তিব্বত নিয়ে চীনের দীর্ঘদিনের সংবেদনশীল অবস্থানের কারণে নেপালও দেশটির ভূখণ্ডে চীনবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়ে থাকে। তিব্বতি শরণার্থীদের প্রতিবাদ, সমাবেশ কিংবা অন্যান্য কর্মকাণ্ড নেপালের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
দালাই লামাকে ঘিরে নেপালে বিভিন্ন অনুষ্ঠান নিয়েও অতীতে বিতর্ক হয়েছে। তাঁর জন্মদিনের আয়োজন সাধারণত মঠ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। সাম্প্রতিক একটি আয়োজনেও বিদেশি কূটনীতিকদের প্রকাশ্য অংশগ্রহণ নিয়ে চীনে নিযুক্ত সাবেক কয়েকজন নেপালি রাষ্ট্রদূত আপত্তি জানিয়েছিলেন।
ভারত-চীন টানাপোড়েনে নেপালের ভারসাম্য
ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপালের জন্য দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা দীর্ঘদিনের বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। নেপালের বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন সরকার ঐতিহাসিকভাবে চীনের দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকেছে। অন্যদিকে ভারত দীর্ঘদিন ধরে নেপালের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী ও ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী।

বিশ্লেষকদের মতে, তিব্বতবিষয়ক একটি শিক্ষাবিষয়ক সম্মেলন বাতিলের ঘটনা তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান বাতিলের বিষয় নয়; এর সঙ্গে নেপালের কূটনৈতিক স্বাধীনতা, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে স্বাধীনতার প্রশ্নও জড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষক সঞ্জয় উপাধ্যায়ের মতে, কোনো শিক্ষাবিষয়ক তিব্বত আলোচনা যদি শুধু বেইজিংয়ের অস্বস্তির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে নেপালের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সম্মেলন বাতিলে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
আয়োজক আন্তর্জাতিক তিব্বতবিষয়ক গবেষণা সমিতি জানিয়েছে, তারা নেপাল সরকারের কাছ থেকে বারবার আনুষ্ঠানিক লিখিত ব্যাখ্যা চাইলেও তা পায়নি। শেষ মুহূর্তে সম্মেলন বাতিলের কোনো কারণও তাদের জানানো হয়নি।
আয়োজকদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্তের কারণে ভবিষ্যতে নেপালে আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক সম্মেলন আয়োজনের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এতে নেপালের ভাবমূর্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্ভাবনাও রয়েছে।
চীনের চাপ সরাসরি ছিল কি না, তার নিশ্চিত প্রমাণ এখনো সামনে না এলেও সম্মেলন বাতিলের ঘটনায় নেপালের পররাষ্ট্রনীতিতে বেইজিংয়ের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
তিব্বতবিষয়ক সম্মেলন বাতিলের ঘটনা এখন নেপালের জন্য শুধু কূটনৈতিক নয়, বরং শিক্ষার স্বাধীনতা ও নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















