০৩:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
গ্যাস আছে, কিন্তু গ্যাস নেই: বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের আসল হিসাব সবজির দামে নতুন ঝড়: সার সংকট, বিশ্ববাজার ও বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের খাবারের ভবিষ্যৎ জঙ্গিদের হাতে রিমোট নিয়ন্ত্রিত বোমা, সাভার-আশুলিয়ায় পরপর উদ্ধারে পুলিশের উদ্বেগ নেপালে তিব্বতবিষয়ক সম্মেলন বাতিল, চীনের চাপ নিয়ে তীব্র বিতর্ক  ভারত নান্দেডের গুরুদ্বারে সুখবীর বাদলের ওপর হামলা, হাতে সামান্য আঘাত বিরোধীদের ঐক্যে চাপে মোদি সরকার, পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ বিল ঠেকানোর দাবি কংগ্রেসের ভারত খড়গের সভাস্থল ‘শুদ্ধিকরণ’ নিয়ে উত্তাল উত্তরাখণ্ড, বিজেপির বিরুদ্ধে জাতপাতের অভিযোগ মোদির বিদেশনীতি নিয়ে রাহুলের কটাক্ষ, ‘মোদিভক্ত’ হয়ে দেশের লাভ হবে না: খার্গে উত্তরাখণ্ডের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে ধস ও পানির স্রোত, আটকা পড়ার আশঙ্কা ৬ শ্রমিকের তরুণ শক্তির আবেগে সাজছে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস

সবজির দামে নতুন ঝড়: সার সংকট, বিশ্ববাজার ও বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের খাবারের ভবিষ্যৎ

সকালবেলার বাজারে একজন ক্রেতার হাতে এক হাজার টাকা। একসময় এই টাকায় আলু, বেগুন, শসা, করলা, পটোল, ঢ্যাঁড়শ আর টমেটো—কয়েক ধরনের সবজি নিয়ে বাড়ি ফেরা যেত। এখন সেই একই নোটের বড় অংশ শেষ হয়ে যায় দুই-তিন ধরনের সবজি কিনতেই।

ঢাকার বাজারে ২০১৭ সালের সঙ্গে তুলনা করলে বেগুন, শসা, ধুন্দল, বরবটি, করলা ও টমেটোর মতো পরিচিত সবজির দাম অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ বা তিন গুণেরও বেশি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক বাজার-তুলনায় দেখা গেছে, ২০১৭ সালে প্রতি কেজি গোল বেগুনের জাতীয় গড় খুচরা দাম ছিল প্রায় ৪১ টাকা; এখন রাজধানীর বাজারে সেটি ১৫০ টাকায় উঠেছে। শসা ৩০ টাকার কাছাকাছি থেকে বেড়ে ৮০-১০০ টাকা, ধুন্দল প্রায় ২৯ টাকা থেকে ৮০ টাকা এবং টমেটো প্রায় ৬০ টাকা থেকে ১২০-১৪০ টাকায় পৌঁছেছে।

এটি শুধু একটি মৌসুমের বাজার-দরের গল্প নয়। এর পেছনে তৈরি হচ্ছে আরও গভীর একটি প্রশ্ন: বাংলাদেশের কৃষক যদি আগামী মৌসুমে আগের মতো সার, জ্বালানি, শ্রম ও পরিবহন খরচ সামলাতে না পারেন, তাহলে সবজির দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

আর সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু বাজারের ঝুড়িতে পাওয়া যাবে না। এর উত্তর পাওয়া যাবে বাংলাদেশের দরিদ্র পরিবারের খাবারের থালায়, শিশুদের পুষ্টিতে এবং এমন এক অর্থনীতিতে যেখানে মানুষের আয় এখনও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

এক ঝুড়ি সবজির গল্প

সাম্প্রতিক বাজার-তুলনায় আলু, বেগুন, করলা, শসা, টমেটো, পটোল ও ঢ্যাঁড়শ—এই সাত ধরনের সবজি মাসে চার কেজি করে কিনতে একটি পরিবারের ব্যয় ২০১৭ সালের প্রায় ১ হাজার ৫০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৫৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ একই পরিমাণ সবজির জন্য অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ৪৯০ টাকা দিতে হচ্ছে।

কাঁচাবাজারে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে সবজির দাম, চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

এই হিসাবটি বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাছ, মাংস ও ডিমের মতো প্রাণিজ প্রোটিনের দাম দীর্ঘদিন ধরে অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে। ফলে অপেক্ষাকৃত সস্তা ও সহজলভ্য সবজি ছিল খাদ্যতালিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভরসা।

এখন সেই বিকল্পও যদি ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, পরিবারগুলোকে সাধারণত তিনটি পথের একটিতে যেতে হয়—কম পরিমাণ খাবার কেনা, সস্তা কিন্তু কম বৈচিত্র্যের খাবারে ঝুঁকে পড়া, অথবা খাদ্যবহির্ভূত খরচ কমানো।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনটিই উদ্বেগের কারণ।

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থেকেছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি পণ্যের দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।

অর্থাৎ বাজারে সবজির দাম বাড়ার অর্থ শুধু রান্নাঘরের হিসাব বদলে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো—একই আয়ে একটি পরিবার আগের তুলনায় কম স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারছে।

এবার সামনে আসছে সারের প্রশ্ন

সবজির বাজার নিয়ে আলোচনায় সাধারণত বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, পরিবহন, মধ্যস্বত্বভোগী ও সরবরাহের কথা আসে। কিন্তু কৃষকের উৎপাদন খরচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি এখন নতুন করে আলোচনায় আসছে—সার।

বাংলাদেশের কৃষি দীর্ঘদিন ধরেই আমদানিনির্ভর সারের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সাতটি রাষ্ট্রীয় সার কারখানার সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ৩৭ লাখ টনের বেশি হলেও উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ০৬ লাখ টন। বিপরীতে জাতীয় চাহিদা ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টন। ফলে চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি পূরণ করতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

এই ব্যবধানটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের কারখানাগুলো পর্যাপ্ত সার দিতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, জাহাজভাড়া, জ্বালানি খরচ এবং বিনিময় হার—সবকিছুর চাপ শেষ পর্যন্ত কৃষকের উৎপাদন খরচে এসে পড়ে।

গ্যাস সংকটে বাড়ছে সারের আমদানি নির্ভরতা, রাষ্ট্রায়ত্ত ৭ কারখানার পাঁচটিই  বন্ধ | The Daily Star

এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ চট্টগ্রামে। বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ডিএপি সার কারখানা কাঁচামাল ফসফরিক অ্যাসিডের সংকটে ২৮ জুন থেকে বন্ধ ছিল। আন্তর্জাতিক সরবরাহে বিঘ্নের কারণে একাধিক দরপত্রে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করা যায়নি।

সরকার অবশ্য আমদানি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। জুনে ৩০ হাজার টন টিএসপি সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয় প্রতি টন ৭১৩ ডলার দরে। একই সময়ে ৩০ হাজার টন দানাদার ইউরিয়া কেনার জন্য প্রতি টন ৫৪০ দশমিক ৭৫ ডলার দর অনুমোদিত হয়।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের সমস্যাটি এখানেই শেষ নয়।

বিশ্ববাজারেও সারের দাম অস্থির

২০২৬ সালের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক সারবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। বিশ্বব্যাংকের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বৈশ্বিক সারের দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছিল। জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ডিএপি সারের দাম প্রায় ২৫৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ইউরিয়া অবশ্য এপ্রিলের তীব্র ঊর্ধ্বগতির পর জুনে কিছুটা নেমেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এই বাজারকে আরও অনিশ্চিত করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল, গ্যাস ও সার পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় ইউরিয়ার দাম এক পর্যায়ে এক মাসে ৪৬ শতাংশ বেড়েছিল। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, সংঘাতের পর ইউরিয়ার দাম প্রায় ৪০০ ডলার থেকে ৮৫০ ডলারের ওপরে উঠেছিল, পরে জুনে প্রায় ৪৫৩ ডলারে নেমে আসে। ডিএপির দামও প্রায় ৫৮০ ডলার থেকে ৭৭০ ডলারের কাছাকাছি উঠেছিল।

এর অর্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: সারবাজারে এখন শুধু দাম বেশি নয়, দাম কত দ্রুত বদলে যেতে পারে সেটিও বড় ঝুঁকি।

জুনে বিশ্বব্যাংকের পণ্যবাজার সূচকে সারদামের মাসিক পতন ২১ দশমিক ৮ শতাংশ হলেও একই প্রতিষ্ঠান এপ্রিলের পূর্বাভাসে বলেছিল, ২০২৬ সালে সারদাম গড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই ওঠানামা কৃষকের সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তোলে।

রাজশাহীতে নতুন পদ্ধতিতে বাড়ছে পেঁয়াজ বীজের উৎপাদন

সার ব্যয় বাড়লে সবজির দাম কীভাবে বাড়ে?

এখানে একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে সার ৩০ শতাংশ বাড়লেই বাজারে সবজির দাম ৩০ শতাংশ বাড়বে—এমন সরল সম্পর্ক নেই।

কৃষকের মোট ব্যয়ের মধ্যে সার একটি অংশ। এর সঙ্গে রয়েছে বীজ, সেচ, শ্রম, জমির ভাড়া, কীটনাশক, জ্বালানি, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ। আবার কোন ফসলে কত সার লাগে, সেটিও ভিন্ন।

কিন্তু সারদাম বাড়ার একটি বহুগুণ প্রভাব থাকতে পারে।

কৃষক যদি বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হন, তাহলে উৎপাদন খরচ বাড়বে। তিনি যদি সার কম ব্যবহার করেন, উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে। একই সময়ে বৃষ্টি বা জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষতি হলে বাজারে সরবরাহ আরও কমতে পারে। উৎপাদন কম এবং চাহিদা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলে খুচরা বাজারে দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

বাংলাদেশে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায়ও কাঠামোগত ব্যয় রয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশের লজিস্টিক ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ১০ শতাংশ। উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ও বাজারের অনিয়ম—সবই খাদ্যদামের ওপর চাপ তৈরি করছে।

অর্থাৎ কৃষকের খেতে সার ব্যয় বাড়ার সঙ্গে ঢাকার বাজারে দাম বাড়ার মাঝখানে আরও কয়েকটি স্তর রয়েছে। প্রতিটি স্তরে সামান্য করে ব্যয় যোগ হলে ভোক্তার জন্য তা বড় হয়ে দেখা দিতে পারে।

সামনে কী হতে পারে?

আগামী কয়েক মাসের সবজির বাজার নিয়ে নিশ্চিত কোনো একটি দাম বলা সম্ভব নয়। বরং তিনটি সম্ভাব্য পথ সামনে দেখা যাচ্ছে।

প্রথমটি হলো স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরে আসা। সার আমদানি সময়মতো হলে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা কমলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সবজির সরবরাহ বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বর্তমানের কিছু উচ্চ দাম কমে আসার সুযোগ আছে।

সার-জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নে ধুঁকছে কৃষি | কালবেলা

দ্বিতীয়টি হলো উচ্চ কিন্তু স্থিতিশীল দাম। সার, শ্রম, পরিবহন ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় যদি নিচে না নামে, তাহলে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও কয়েক বছর আগের দামে সবজি ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বাজার হয়তো নতুন একটি উচ্চ মূল্যস্তরে স্থির হয়ে যেতে পারে।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হলো—সার সরবরাহে ঘাটতি, আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন মূল্যবৃদ্ধি এবং খারাপ আবহাওয়া একই সময়ে দেখা দেওয়া। সে ক্ষেত্রে সবজির দাম শুধু সাময়িকভাবে বাড়বে না; উৎপাদন কমে গিয়ে পরবর্তী মৌসুমেও তার প্রভাব থাকতে পারে।

বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সার ও জ্বালানির দামের অস্থিরতা সামাল দিতে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তা অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ৩০ কোটি ডলার সার আমদানিতে সহায়তার জন্য, বিশেষ করে আমন ও বোরো মৌসুমের প্রয়োজন মেটাতে।

এটি দেখায় যে সার সংকটকে এখন আর শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের সরবরাহ-সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বাজারে নয়, খাবারের প্লেটে

বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সমস্যা শেষ হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ০৬ শতাংশ, আর জুন ২০২৬-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। একই সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।

এই সংখ্যাগুলো একজন অর্থনীতিবিদের কাছে একটি সামষ্টিক সূচক। কিন্তু একটি নিম্ন আয়ের পরিবারের কাছে এর অর্থ অন্যরকম।

এর অর্থ হতে পারে, দুপুরের রান্নায় আগে যে তিন ধরনের সবজি থাকত, এখন থাকবে একটি। শিশুর টিফিনে ফল বা সবজির বদলে আসবে সস্তা শর্করা। পরিবারের সদস্যরা হয়তো মাছ বা মাংসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সবজি কেনার বদলে শুধু ভাত ও আলুর ওপর বেশি নির্ভর করবেন।

এখানেই অর্থনৈতিক সংকট স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নেয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিষয়ক ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং খাদ্য অনিরাপত্তা ও শিশুর অপুষ্টির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনের মূল বিষয়ও হচ্ছে—স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যয়।

বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষ উদ্বেগের। কারণ দেশের দরিদ্র পরিবারগুলো যখন প্রাণিজ প্রোটিনের দাম সামলাতে পারে না, তখন শাকসবজি খাদ্যের বৈচিত্র্য ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। সেই সবজিও যদি ব্যয়বহুল হয়, পরিবারের খাদ্যতালিকা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

ক্ষেতে বেগুনের দাম ১৫-২০ টাকা, বাজারে নিয়ে দ্বিগুণ লাভ করছেন আড়তদার

সবজির দাম তাই শুধু বাজারের খবর নয়

একটি বেগুন ১৫০ টাকা হলো কি না—এটি বাজারের একটি সংখ্যা। কিন্তু সেই সংখ্যার পেছনে আছে কৃষকের সার কেনার খরচ, কারখানার গ্যাসের সংকট, আন্তর্জাতিক কাঁচামালের দাম, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি, পরিবহন ব্যয়, বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত জমি এবং সর্বশেষে একজন ক্রেতার সীমিত আয়।

এই কারণেই বাংলাদেশের সবজির বাজারকে এখন শুধু ‘মৌসুমি দাম ওঠানামা’ দিয়ে দেখা যথেষ্ট নয়।

যদি সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, আমদানির ঝুঁকি কমানো না যায়, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা দূর না হয়, তাহলে সবজির দাম একটি নতুন উচ্চতর স্বাভাবিকতায় ঢুকে যেতে পারে।

আর সেই নতুন স্বাভাবিকতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে যাদের আয় সবচেয়ে কম।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হবে না—বেগুনের দাম কত, শসার দাম কত বা টমেটো কত টাকা কেজি।

প্রশ্ন হবে, একজন নিম্ন আয়ের বাংলাদেশি পরিবার তার মাসিক আয়ের কত অংশ খরচ করে এমন একটি খাবারের ঝুড়ি কিনতে পারছে, যা তাকে শুধু পেট ভরাবে না, সুস্থও রাখবে।

কারণ বাজারে সবজির দাম বেড়ে যাওয়া অর্থনীতির একটি সমস্যা। কিন্তু মানুষ যখন সেই সবজি কেনা কমিয়ে দেয়, তখন সেটি আর শুধু অর্থনীতির সমস্যা থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনযাত্রার সমস্যা।

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্যাস আছে, কিন্তু গ্যাস নেই: বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের আসল হিসাব

সবজির দামে নতুন ঝড়: সার সংকট, বিশ্ববাজার ও বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের খাবারের ভবিষ্যৎ

০২:৫৯:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

সকালবেলার বাজারে একজন ক্রেতার হাতে এক হাজার টাকা। একসময় এই টাকায় আলু, বেগুন, শসা, করলা, পটোল, ঢ্যাঁড়শ আর টমেটো—কয়েক ধরনের সবজি নিয়ে বাড়ি ফেরা যেত। এখন সেই একই নোটের বড় অংশ শেষ হয়ে যায় দুই-তিন ধরনের সবজি কিনতেই।

ঢাকার বাজারে ২০১৭ সালের সঙ্গে তুলনা করলে বেগুন, শসা, ধুন্দল, বরবটি, করলা ও টমেটোর মতো পরিচিত সবজির দাম অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ বা তিন গুণেরও বেশি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক বাজার-তুলনায় দেখা গেছে, ২০১৭ সালে প্রতি কেজি গোল বেগুনের জাতীয় গড় খুচরা দাম ছিল প্রায় ৪১ টাকা; এখন রাজধানীর বাজারে সেটি ১৫০ টাকায় উঠেছে। শসা ৩০ টাকার কাছাকাছি থেকে বেড়ে ৮০-১০০ টাকা, ধুন্দল প্রায় ২৯ টাকা থেকে ৮০ টাকা এবং টমেটো প্রায় ৬০ টাকা থেকে ১২০-১৪০ টাকায় পৌঁছেছে।

এটি শুধু একটি মৌসুমের বাজার-দরের গল্প নয়। এর পেছনে তৈরি হচ্ছে আরও গভীর একটি প্রশ্ন: বাংলাদেশের কৃষক যদি আগামী মৌসুমে আগের মতো সার, জ্বালানি, শ্রম ও পরিবহন খরচ সামলাতে না পারেন, তাহলে সবজির দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

আর সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু বাজারের ঝুড়িতে পাওয়া যাবে না। এর উত্তর পাওয়া যাবে বাংলাদেশের দরিদ্র পরিবারের খাবারের থালায়, শিশুদের পুষ্টিতে এবং এমন এক অর্থনীতিতে যেখানে মানুষের আয় এখনও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

এক ঝুড়ি সবজির গল্প

সাম্প্রতিক বাজার-তুলনায় আলু, বেগুন, করলা, শসা, টমেটো, পটোল ও ঢ্যাঁড়শ—এই সাত ধরনের সবজি মাসে চার কেজি করে কিনতে একটি পরিবারের ব্যয় ২০১৭ সালের প্রায় ১ হাজার ৫০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৫৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ একই পরিমাণ সবজির জন্য অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ৪৯০ টাকা দিতে হচ্ছে।

কাঁচাবাজারে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে সবজির দাম, চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

এই হিসাবটি বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাছ, মাংস ও ডিমের মতো প্রাণিজ প্রোটিনের দাম দীর্ঘদিন ধরে অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে। ফলে অপেক্ষাকৃত সস্তা ও সহজলভ্য সবজি ছিল খাদ্যতালিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভরসা।

এখন সেই বিকল্পও যদি ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, পরিবারগুলোকে সাধারণত তিনটি পথের একটিতে যেতে হয়—কম পরিমাণ খাবার কেনা, সস্তা কিন্তু কম বৈচিত্র্যের খাবারে ঝুঁকে পড়া, অথবা খাদ্যবহির্ভূত খরচ কমানো।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনটিই উদ্বেগের কারণ।

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থেকেছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি পণ্যের দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।

অর্থাৎ বাজারে সবজির দাম বাড়ার অর্থ শুধু রান্নাঘরের হিসাব বদলে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো—একই আয়ে একটি পরিবার আগের তুলনায় কম স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারছে।

এবার সামনে আসছে সারের প্রশ্ন

সবজির বাজার নিয়ে আলোচনায় সাধারণত বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, পরিবহন, মধ্যস্বত্বভোগী ও সরবরাহের কথা আসে। কিন্তু কৃষকের উৎপাদন খরচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি এখন নতুন করে আলোচনায় আসছে—সার।

বাংলাদেশের কৃষি দীর্ঘদিন ধরেই আমদানিনির্ভর সারের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সাতটি রাষ্ট্রীয় সার কারখানার সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ৩৭ লাখ টনের বেশি হলেও উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ০৬ লাখ টন। বিপরীতে জাতীয় চাহিদা ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টন। ফলে চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি পূরণ করতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।

এই ব্যবধানটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের কারখানাগুলো পর্যাপ্ত সার দিতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, জাহাজভাড়া, জ্বালানি খরচ এবং বিনিময় হার—সবকিছুর চাপ শেষ পর্যন্ত কৃষকের উৎপাদন খরচে এসে পড়ে।

গ্যাস সংকটে বাড়ছে সারের আমদানি নির্ভরতা, রাষ্ট্রায়ত্ত ৭ কারখানার পাঁচটিই  বন্ধ | The Daily Star

এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ চট্টগ্রামে। বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ডিএপি সার কারখানা কাঁচামাল ফসফরিক অ্যাসিডের সংকটে ২৮ জুন থেকে বন্ধ ছিল। আন্তর্জাতিক সরবরাহে বিঘ্নের কারণে একাধিক দরপত্রে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করা যায়নি।

সরকার অবশ্য আমদানি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। জুনে ৩০ হাজার টন টিএসপি সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয় প্রতি টন ৭১৩ ডলার দরে। একই সময়ে ৩০ হাজার টন দানাদার ইউরিয়া কেনার জন্য প্রতি টন ৫৪০ দশমিক ৭৫ ডলার দর অনুমোদিত হয়।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের সমস্যাটি এখানেই শেষ নয়।

বিশ্ববাজারেও সারের দাম অস্থির

২০২৬ সালের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক সারবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। বিশ্বব্যাংকের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বৈশ্বিক সারের দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছিল। জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ডিএপি সারের দাম প্রায় ২৫৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ইউরিয়া অবশ্য এপ্রিলের তীব্র ঊর্ধ্বগতির পর জুনে কিছুটা নেমেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এই বাজারকে আরও অনিশ্চিত করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল, গ্যাস ও সার পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় ইউরিয়ার দাম এক পর্যায়ে এক মাসে ৪৬ শতাংশ বেড়েছিল। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, সংঘাতের পর ইউরিয়ার দাম প্রায় ৪০০ ডলার থেকে ৮৫০ ডলারের ওপরে উঠেছিল, পরে জুনে প্রায় ৪৫৩ ডলারে নেমে আসে। ডিএপির দামও প্রায় ৫৮০ ডলার থেকে ৭৭০ ডলারের কাছাকাছি উঠেছিল।

এর অর্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: সারবাজারে এখন শুধু দাম বেশি নয়, দাম কত দ্রুত বদলে যেতে পারে সেটিও বড় ঝুঁকি।

জুনে বিশ্বব্যাংকের পণ্যবাজার সূচকে সারদামের মাসিক পতন ২১ দশমিক ৮ শতাংশ হলেও একই প্রতিষ্ঠান এপ্রিলের পূর্বাভাসে বলেছিল, ২০২৬ সালে সারদাম গড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই ওঠানামা কৃষকের সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তোলে।

রাজশাহীতে নতুন পদ্ধতিতে বাড়ছে পেঁয়াজ বীজের উৎপাদন

সার ব্যয় বাড়লে সবজির দাম কীভাবে বাড়ে?

এখানে একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে সার ৩০ শতাংশ বাড়লেই বাজারে সবজির দাম ৩০ শতাংশ বাড়বে—এমন সরল সম্পর্ক নেই।

কৃষকের মোট ব্যয়ের মধ্যে সার একটি অংশ। এর সঙ্গে রয়েছে বীজ, সেচ, শ্রম, জমির ভাড়া, কীটনাশক, জ্বালানি, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ। আবার কোন ফসলে কত সার লাগে, সেটিও ভিন্ন।

কিন্তু সারদাম বাড়ার একটি বহুগুণ প্রভাব থাকতে পারে।

কৃষক যদি বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হন, তাহলে উৎপাদন খরচ বাড়বে। তিনি যদি সার কম ব্যবহার করেন, উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে। একই সময়ে বৃষ্টি বা জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষতি হলে বাজারে সরবরাহ আরও কমতে পারে। উৎপাদন কম এবং চাহিদা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলে খুচরা বাজারে দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

বাংলাদেশে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায়ও কাঠামোগত ব্যয় রয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশের লজিস্টিক ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ১০ শতাংশ। উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ও বাজারের অনিয়ম—সবই খাদ্যদামের ওপর চাপ তৈরি করছে।

অর্থাৎ কৃষকের খেতে সার ব্যয় বাড়ার সঙ্গে ঢাকার বাজারে দাম বাড়ার মাঝখানে আরও কয়েকটি স্তর রয়েছে। প্রতিটি স্তরে সামান্য করে ব্যয় যোগ হলে ভোক্তার জন্য তা বড় হয়ে দেখা দিতে পারে।

সামনে কী হতে পারে?

আগামী কয়েক মাসের সবজির বাজার নিয়ে নিশ্চিত কোনো একটি দাম বলা সম্ভব নয়। বরং তিনটি সম্ভাব্য পথ সামনে দেখা যাচ্ছে।

প্রথমটি হলো স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরে আসা। সার আমদানি সময়মতো হলে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা কমলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সবজির সরবরাহ বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বর্তমানের কিছু উচ্চ দাম কমে আসার সুযোগ আছে।

সার-জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নে ধুঁকছে কৃষি | কালবেলা

দ্বিতীয়টি হলো উচ্চ কিন্তু স্থিতিশীল দাম। সার, শ্রম, পরিবহন ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় যদি নিচে না নামে, তাহলে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও কয়েক বছর আগের দামে সবজি ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বাজার হয়তো নতুন একটি উচ্চ মূল্যস্তরে স্থির হয়ে যেতে পারে।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হলো—সার সরবরাহে ঘাটতি, আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন মূল্যবৃদ্ধি এবং খারাপ আবহাওয়া একই সময়ে দেখা দেওয়া। সে ক্ষেত্রে সবজির দাম শুধু সাময়িকভাবে বাড়বে না; উৎপাদন কমে গিয়ে পরবর্তী মৌসুমেও তার প্রভাব থাকতে পারে।

বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সার ও জ্বালানির দামের অস্থিরতা সামাল দিতে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তা অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ৩০ কোটি ডলার সার আমদানিতে সহায়তার জন্য, বিশেষ করে আমন ও বোরো মৌসুমের প্রয়োজন মেটাতে।

এটি দেখায় যে সার সংকটকে এখন আর শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের সরবরাহ-সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বাজারে নয়, খাবারের প্লেটে

বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সমস্যা শেষ হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ০৬ শতাংশ, আর জুন ২০২৬-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। একই সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।

এই সংখ্যাগুলো একজন অর্থনীতিবিদের কাছে একটি সামষ্টিক সূচক। কিন্তু একটি নিম্ন আয়ের পরিবারের কাছে এর অর্থ অন্যরকম।

এর অর্থ হতে পারে, দুপুরের রান্নায় আগে যে তিন ধরনের সবজি থাকত, এখন থাকবে একটি। শিশুর টিফিনে ফল বা সবজির বদলে আসবে সস্তা শর্করা। পরিবারের সদস্যরা হয়তো মাছ বা মাংসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সবজি কেনার বদলে শুধু ভাত ও আলুর ওপর বেশি নির্ভর করবেন।

এখানেই অর্থনৈতিক সংকট স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নেয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিষয়ক ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং খাদ্য অনিরাপত্তা ও শিশুর অপুষ্টির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনের মূল বিষয়ও হচ্ছে—স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যয়।

বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষ উদ্বেগের। কারণ দেশের দরিদ্র পরিবারগুলো যখন প্রাণিজ প্রোটিনের দাম সামলাতে পারে না, তখন শাকসবজি খাদ্যের বৈচিত্র্য ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। সেই সবজিও যদি ব্যয়বহুল হয়, পরিবারের খাদ্যতালিকা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

ক্ষেতে বেগুনের দাম ১৫-২০ টাকা, বাজারে নিয়ে দ্বিগুণ লাভ করছেন আড়তদার

সবজির দাম তাই শুধু বাজারের খবর নয়

একটি বেগুন ১৫০ টাকা হলো কি না—এটি বাজারের একটি সংখ্যা। কিন্তু সেই সংখ্যার পেছনে আছে কৃষকের সার কেনার খরচ, কারখানার গ্যাসের সংকট, আন্তর্জাতিক কাঁচামালের দাম, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি, পরিবহন ব্যয়, বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত জমি এবং সর্বশেষে একজন ক্রেতার সীমিত আয়।

এই কারণেই বাংলাদেশের সবজির বাজারকে এখন শুধু ‘মৌসুমি দাম ওঠানামা’ দিয়ে দেখা যথেষ্ট নয়।

যদি সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, আমদানির ঝুঁকি কমানো না যায়, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা দূর না হয়, তাহলে সবজির দাম একটি নতুন উচ্চতর স্বাভাবিকতায় ঢুকে যেতে পারে।

আর সেই নতুন স্বাভাবিকতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে যাদের আয় সবচেয়ে কম।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হবে না—বেগুনের দাম কত, শসার দাম কত বা টমেটো কত টাকা কেজি।

প্রশ্ন হবে, একজন নিম্ন আয়ের বাংলাদেশি পরিবার তার মাসিক আয়ের কত অংশ খরচ করে এমন একটি খাবারের ঝুড়ি কিনতে পারছে, যা তাকে শুধু পেট ভরাবে না, সুস্থও রাখবে।

কারণ বাজারে সবজির দাম বেড়ে যাওয়া অর্থনীতির একটি সমস্যা। কিন্তু মানুষ যখন সেই সবজি কেনা কমিয়ে দেয়, তখন সেটি আর শুধু অর্থনীতির সমস্যা থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনযাত্রার সমস্যা।